জয় বাংলার লোক
সুজন দেবনাথ

‘জয় বাংলার লোক – ঢ্যালা ঢ্যালা চোখ
আতপ চালের ভাত খেয়ে ক্যাম্পে গিয়ে ঢোক।’

৪২ বছরের হিরণ্ময়ীকে একটি বাচ্চা ছেলে এই দুই লাইনের ছড়া বলে খ্যাপাচ্ছে। হিরন্ময়ী জয় বাংলার লোক। আর বাচ্চাটি কলকাতার। সময় ১৯৭১ সালের অক্টোবর। পাকিস্তানীদের অত্যাচারে হিরণ্ময়ীর পরিবার ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। আসার পথে কয়েকদিন হরিণাঘাটা শরণার্থী ক্যাম্পে ছিলো। আর এখন কলকাতায় আত্মীয়ের বাড়িতে আছে। যে ছেলেটি ছড়া বলছে, সেও হিরণ্ময়ীর আত্মীয়। অল্প বয়সের ছেলে, তেমন কিছু না বুঝে মজা করছে, হিরন্ময়ীও হাসছে। তবু হাসতে হাসতেই তার মাথায় তীব্র জ্বালা শুরু হয়ে গেলো। ছড়ার শব্দগুলো সে আর সহ্য করতে পারছে না। কে যেন তার মস্তিষ্কের নিউরণে আঘাত করছে আর বলছে, ‘জয় বাংলার লোক – ক্যাম্পে গিয়ে ঢোক’।
তারা এখন শরণার্থী, অন্যের শরণে আছে। ক্যাম্পেও ছিলো কয়েকদিন। তাদের কষ্টের জীবনকে কটাক্ষ করে ছড়া বানাচ্ছে কেউ। তাদের থেকেই বাচ্চাটা শিখেছে। তীব্র অপমান লাগছে হিরণ্ময়ীর। সে ভাবছে, এই অপমান তো মাত্র শুরু, এটা চলতেই থাকবে। গত কয়েক মাসের কষ্টের চেয়েও সামনের দিনের অপমানের আশংকা তাকে পেয়ে বসলো। বাংলাদেশে যে বাড়ি-ঘর তারা ফেলে এসেছে, সেই তুলনায় কলকাতার এইসব বাড়িঘর একেবারেই খুপরি, বস্তির মতো। তবু এখানে সে শরণার্থী, তাই তাকে অপমান সইতেই হবে। এই দেশে সে জীবন বাঁচানোর আশ্রয় পেয়েছে, তাতে সে কৃতজ্ঞ। তবু সেই আশ্রয় নিয়ে কটাক্ষ চলতে থাকলে, তা সহ্য করা কঠিন হবে। তখন আর বেশিদিন কৃতজ্ঞতা থাকবে না। ছেলেটি বলে চলছে,

‘জয় বাংলার লোক – ঢ্যালা ঢ্যালা চোখ,
আতপ চালের ভাত খেয়ে ক্যাম্পে গিয়ে ঢোক।’
হঠাৎ হিরন্ময়ী চিৎকার করে উঠলো,
‘ইন্ডিয়ার লোক, ফুলা ফুলা চোউখ,
আলা চাউলের ভাত খাইয়া খুপরিতে গিয়া ঢোক।’

সেই মুহুর্তে আকাশের দিকে তাকিয়ে হিরণ্ময়ী সিদ্ধান্ত নিলো, বাংলাদেশ স্বাধীন হলে, এক মুহূর্তও সে ইন্ডিয়ায় থাকবে না। দেশ স্বাধীন না হলেও, সে এখানে থাকতে পারবে না। দেশে ফিরতেই হবে। মরতে হলে স্বামীর ভিটায়ই মরবে। ইতিহাসের নিয়মে দুমাস পরেই বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। হিরণ্ময়ীর মা বললো, ‘তোদের বাড়ি ঘর তো সব পুড়িয়ে দিয়েছে, ফিরে গিয়ে তো আবার বিপদেই পরবি, তার চেয়ে আমাদের সাথে এখানেই থেকে যা’। হিরণ্ময়ী বললো, ‘নাগো মা, কইলকাতা আমাগো দেশ না, আমরা জয় বাংলার লোক’।
স্বামীকে বললো, যতো তাড়াতাড়ি হয়, দেশে ফেরার ব্যবস্থা করেন। নিজের দেশের পোড়া ঘরের পীরায় বইস্যাও সুখ। স্বামী উত্তর দিলো, হ, তুমি তো জয় বাংলার লোক।

[এই হিরণ্ময়ী দেবী আমার ঠাকুরমা]
লেখক// সুজন দেবনাথ (অব্যয় অনিন্দ্য), ফার্স্ট সেক্রেটারি, বাংলাদেশ দূতাবাস, এথেন্স

LEAVE A REPLY