নিউরন ও কৃত্রিম নিউরন (১ম পর্ব )

কথা বলতে, চিন্তা করতে, সমস্যা সমাধান করতে মানুষের যে অঙ্গটি ব্যবহার হয়, সেটি হচ্ছে মানুষের মস্তিষ্ক। মানব দেহের গুরুত্বপূর্ণ ও আশ্চর্যজনক অঙ্গ এটি । একটি আদর্শ মস্তিষ্কে ১০০ বিলিয়নের (তবে ৫০ বিলিয়ন থেকে ৫০০ বিলিয়ন পর্যন্ত থাকতে পারে) অতিক্ষুদ্র কোষ থাকে—যাকে নিউরন বলা হয়।

নিউরন গুলো অত্যান্ত ক্ষুদ্রাকার হয়ে থাকে। মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ কোষের মাত্র ১০ শতাংশ জুড়ে নিউরনের অবস্থান থাকে, বাকি কোষ গুলোকে গ্লিয়াল কোষ (Glial Cells) বা নিউরগ্লিয়া (Neuroglia) বলে, এগুলো নিউরনকে সমর্থন এবং রক্ষা করে এবং নিউরনে শক্তির সঞ্চার করে।

 

অন্যভাবে বলা যায় স্নায়ুতন্ত্রের গঠনমূলক ও কার্যকরী একককে নিউরন বা স্নায়ুকোষ বলে। একটিমাত্র মানব মগজে রয়েছে ১০০ বিলিয়নের  মত   স্নায়ুকোষ । আর এগুলো একটি আরেকটির সাথে সংযুক্ত রয়েছে তেমনি শত শত কোটি স্নায়ুতন্তু দিয়ে। প্রতিটি নিউরনে দুটি অংশ থাকে।

১. কোষদেহ ও ২. প্রলম্বিত অংশ।

কোষদেহ: এটি নিউরনের প্রধান অংশ এবং এটি গোলাকার, ডিম্বাকার, মোচাকারসহ বিভিন্ন আকৃতির হয়ে থাকে। কোষদেহের ব্যাস ৬ মাইক্রন থেকে ১২০ মাইক্রন পর্যন্ত হতে পারে। কোষদেহ কোষপর্দা, সাইটোপ্লাজম ও নিউক্লিয়াস এ তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত।

প্রলম্বিত অংশ: দেহকোষ থেকে নির্গত বা বহির্গত শাখা-প্রশাখাকে প্রলম্বিত অংশ বলে। এটি দু’ধরনের হয়

ক. ডেনড্রাইট (Dendrite) ও খ. অ্যাক্সন (Axon)।

ডেনড্রাইট (Dendrite): ডেনড্রাইট কোষদেহের চারদিকে সৃষ্ট ক্ষুদ্র তন্তুময় শাখাবিশিষ্ট অংশকে ডেনড্রাইট বলে। একটি নিউরনে বহু ডেনড্রাইট থাকে।ডেনড্রাইটগুলোই আসলে মূলত সেই অংশ যা মানব দেহের বিভন্ন ইন্দ্রিয় থেকে অথবা অন্য নিউরণ থেকে তথ্য গ্রহণ করে। ডেনড্রাইটের সংখ্যা যত বেশি হবে, একটি নিউরণের তথ্য গ্রহণের ক্ষমতাও তত বেশি হবে। একটি নিউরণের ডেন্ড্রাইটের সংখ্যা ৪,০০,০০০ পর্যন্তও হতে পারে!

 

অ্যাক্সন (Axon): অ্যাক্সন কোষদেহ থেকে উত্পন্ন বেশ লম্বা ও শাখাবিহীন তন্তুটির নাম অ্যাক্সন। অ্যাক্সনের চারদিকে চ্যাপ্টা সোয়ান কোষ নির্মিত পাতলা আবরণকে নিউরিলেমা বলে। নিউরিলেমা পরিবেষ্টিত অ্যাক্সনকে স্নায়ুতন্তু বলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিউরিলেমা ও অ্যাক্সনের মধ্যবর্তী অঞ্চলে স্নেহপদার্থের একটি স্তর থাকে। এ স্তরটিকে মায়েলিন (Myelin) আবরণ বলে। নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর অন্তর অ্যাক্সনে কিছু সঙ্কুচিত অঞ্চল দেখতে পাওয়া যায়, একে র্যানভিয়ের-এর পর্ব বলে। অ্যাক্সনের মূল অক্ষের আবরণীকে এক্সোলেমা বলে। অ্যাক্সনের শেষ প্রান্ত বিভক্ত হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শাখা সৃষ্টি করে, সেগুলোকে টেলোডেনড্রিয়া বলে। টেলোডেনড্রিয়ার শেষ প্রান্তের স্ফীত অংশের নাম সিন্যাপটিক নব।

 পরপর দুটো নিউরনের প্রথমটার অ্যাক্সন এবং পরেরটার ডেনড্রাইটের মধ্যে একটি স্নায়ুসন্ধি গঠিত হয়, একে সিন্যাপস বলে। অ্যাক্সন লম্বায় এক মিটারের বেশি হতে পারে। বহুসংখ্যক নিউরণ মিলিত হয়ে একটি স্নায়ু (Nerve) গঠিত হয়।

নিউরন বা স্নায়ুকোষ তথা স্নায়ুকলার (Nervous Tissue) সাধারণত যা করে:
১.  বিভিন্ন উদ্দীপনা গ্রহণ করে এবং তদনুযায়ী প্রতিবেদন সৃষ্টি করে।
২. এটি মস্তিষ্কে যাবতীয় স্মৃতি সংরক্ষণ করে।
৩. এটি দেহের বিভিন্ন অঙ্গ ও তন্ত্রের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে।
৪. এটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং তার বাস্তবায়ন করে।

 

অপরদিকে কম্পিউটারে মানুষের ব্রেইন কোষের বদলে অত্যন্ত ক্ষুদ্রাকার সুইচ লাগানো থাকে, যাকে ট্র্যানজিস্টর বলা হয়। বর্তমান প্রযুক্তির সর্বাধুনিক মাইক্রো প্রসেসরে ২ বিলিয়নেরও উপর ট্র্যানজিস্টর লাগানো থাকে। সাধারন মাইক্রো প্রসেসর গুলোতে ৫০ মিলিয়নের মতো ট্র্যানজিস্টর লাগানো থাকে এবং এই সমস্ত জিনিস গুলো একত্রে একটি সার্কিটের উপর বসানো থাকে, যা ২৫ মিলিমিটার বর্গাকার হয়ে থাকে।
কম্পিউটার একটি ধাতব বাক্স আর এটি বাইনারি নাম্বার(শুন্য বা এক) এর উপর কাজ করে এবং মস্তিষ্ক হলো একটি জীবন্ত জিনিস যা অনুভূতি এবং স্মৃতিশক্তির উপর কাজ করে।কিন্তু এটি কম্পিউটার আর ব্রেইনের মধ্যে একমাত্র পার্থক্য নয়। আসল পার্থক্য হলো কম্পিউটার এবং মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ আলাদা পদ্ধতিতে কাজ করে। কম্পিউটার প্রসেসরে ট্র্যানজিস্টর গুলো সহজভাবে লাগানো থাকে, প্রত্যেকটি ট্র্যানজিস্টর সাধারনত ২-৩টি ট্র্যানজিস্টরের সাথে কানেক্টেড থাকে, একে লজিক গেটস (Logic Gates) বলা হয়। কিন্তু মস্তিষ্কের মধ্যে নিউরন গুলো অত্যন্ত জটিলভাবে প্যারালেলে পরস্পরের সাথে কানেক্টেড থাকে।

প্রত্যেকটি নিউরন প্রায় ১০,০০০ নিউরনের সাথে কানেক্টেড থাকে। তো কম্পিউটারের কয়েকশত মিলিয়ন ট্র্যানজিস্টর যা সহজভাবে প্যারালেলে লাগানো থাকে আর ব্রেইনে এর চেয়ে ১০-১০০ গুন বেশি কোষ যা জটিলভাবে পরস্পরের সাথে কানেক্টেড থাকে—এদের এই ভিন্ন গঠনের জন্যই কম্পিউটার এবং ব্রেইন সম্পূর্ণ আলাদা ভাবে “ভাবে” এবং কাজ করে। বিশাল পরিমানে ডাটা সংরক্ষিত রাখার জন্য কম্পিউটারকে বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয় এবং এই ডাটাগুলোকে কম্পিউটার কিভাবে প্রসেসিং করবে তা বলে দেওয়ার জন্য কম্পিউটারে কিছু প্রোগ্রাম ইন্সটল করানো হয়।

অপরদিকে, মস্তিষ্ক কোন জিনিস শিখতে দেরি করে, মনে রাখার জন্য বারবার চর্চা করে এবং বিভিন্ন জিনিস বিভিন্নভাবে শিখতে পারে, নিজেই নতুন শেখার পদ্ধতি তৈরি করে নিতে পারে।এভাবেই মানুষ কাজের মধ্যে সৃজনশীল হয়ে উঠে ।

কৃত্রিম নিউরন

নিউরাল নেটওয়ার্ক অথবা যেকোনো নেটওয়ার্ক (যেমন – কিছু কম্পিউটার মিলে একটি লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক অথবা পুরো ওয়েব নেটওয়ার্ক) মুলত একই। বেশ কিছু নোড বা পয়েন্ট একে ওপরের সাথে নির্দিষ্ট কিছু নিয়মে যুক্ত থেকে নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান প্রদান করলেই তাকে একটা নেটওয়ার্ক বলা হয়। নিউরাল নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে সেই নোড (Node) হচ্ছে এক একটি নিউরন। আমাদের ব্রেইনের মধ্যে বস্তুত বিলিয়ন সংখ্যক নিউরনের একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করা আছে। মোটামুটি সেই গঠন শৈলীর উপর ভিত্তি করেই ডাটা থেকে প্যাটার্ন রিকগনিশনের জন্য এক ধরনের কার্যপদ্ধতির নামই হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক। অর্থাৎ সত্যিকারের নিউরান যে নীতিতে কাজ করে, এই নিউরনও একইভাবে কাজ করে। কিন্তু যেহেতু এগুলো সত্যিকারের নিউরন নয় তাই এটার নাম আর্টিফিশিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক।

আমরা যদি একটা সত্যিকারের নিউরনের কার্যনীতির মত একটি নিউরন থেকে আরেক নিউরনের কাছে এক্সনের আউটপুট কে ডেন্ড্ররাইটে ইনপুট দেয়ার ক্ষেত্রে ট্রান্সমিশনের ভূমিকা রাখে। যদি একটি নিউরনের যথেষ্ট পরিমাণ সিন্যাপ্টিক ইনপুট ফায়ার (আশানুরূপ একটা ভ্যালু তৈরি করে) করে তাহলে সেই নিউরনটা ফায়ার করে বা বলা যেতে পারে যে, সেই নিউরনটা অ্যাকটিভ হওয়া।  (চলবে) 

 

লেখক: জেসমিন আক্তার , পদার্থ বিজ্ঞান(৪র্থ বর্ষ), মাইকেল মধুসূদন সরকারি কলেজ, যশোর ।  

 

LEAVE A REPLY