বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র

johirআপনারে বড় বলে, বড় সেই নয়/ লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়। বড় হওয়া সংসারেতে কঠিন ব্যাপার/ সংসারে সে বড় হয়, বড় গুণ যার। গুণেতে হইলে বড়, বড় বলে সবে/ বড় যদি হতে চাও, ছোট হও তবে। লেখাটা যেন কার? কি কবিতা? লেখাটি পড়লেই লেখকের নাম পেয়ে যাবেন।

আজ একটি স্কুলে বিতর্কের কর্মশালার অনুমোদন নিতে গিয়েছিলাম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মন্ডলীগণ আমাদেরকে প্রচুর সহযোগিতা করলেন। আমাদেরকে বিনয়ের সাথে বললেন যে, আপনারা যদি শিক্ষার্থীদের ক্লাসে গিয়ে কর্মশালার ব্যাপারটি বুঝিয়ে বলেন খুব ভাল হতো। আমরাও সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলাম, চললাম ক্লাসে ক্লাসে। প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই আমরা শিক্ষার্থীদের বিতর্কের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য কিছু সহজ প্রশ্ন করি। সাধারণত তারা সেগুলির উত্তর জানেন না। কোন কোন ক্লাসে এক-দু জন দুই-তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন। তখন আমরা তাদেরকে বলি যে, বিতর্ক শিখলে এমন সহজ কেন তার চেয়েও কঠিন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায়!! তখন শিক্ষার্থীদের চোখ ছল ছল করে আর ওরা বিতর্ক কর্মশালা করার জন্য হাত বেঞ্চের উপরে উচু করে তোলে।

আজ একটি ক্লাসের একজন ছাত্র প্রায় সবগুলি প্রশ্নের উত্তরই দিল!! ছেলেটি দেখতেও অনেক সুন্দর। যখন আমরা সবাই মিলে শিক্ষার্থীদের হাত উপরে তুলতে বললাম যে, কে কে বিতর্ক শিখতে চাও? তখন সেই ছেলেটি উপরে হাত তুললো না!!! আমরা বেশ অবাক হলাম। তাকে তাৎক্ষণিক প্রশ্ন না করে পালাম না, ভায়া আপনি হাত তুললেন না যে (হাসি মুখে)? ছেলেটি গম্ভীর মুখে তাচ্ছিল্যের সাথে বললো আমার সময় নেই। আমি তার উত্তর শুনে যতোটা ধাক্কা না খেয়েছি। তার বলার ভঙ্গিটা দেখে তার চেয়ে বেশি বড় ধাক্কা খেয়েছি, অবাক হয়েছি!!! আমি তার অবস্থান বোঝার জন্য আরো কিছু প্রশ্ন করলাম সে এবার আমাকে ভদ্র ভাষায় ছোট করার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো…। আমি থেমে গেলাম এবং এটি ক্লাসে সবার সামনে বলে এলাম যে, বাবা তুমি অনেক জান আর জানার মাঝে যতোটুকু ভুল তাতে তোমার কোন দোষ নেই। উপরের কবিতাটি হরিশচন্দ্র মিত্রের লেখা ‘বড় কে’ কবিতা। কবিতাটি আমি কেন প্রথমেই উল্লেখ করেছি তা এতোক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝেছেন।

আমাদের সমাজে এমন জানেয়ালা অনেকেই আছেন যাদের ব্যাবহারের কারণে মানুষ তাদের পছন্দ করে না। তাদের উচিৎ নিজেদের অহংকারের খোলশ থেকে বের হয়ে আসা এবং মানুষের কল্যানে কাজ করা। কেউ কেউ বলেন এটা তারা পারবে না। কেন পারবে না? আমরা ছোট বেলায় কালি প্রসন্ন ঘোষের কবিতা পড়েছি… পারিব না এ কথাটি বলিও না আর/ কেন পারিবে না তাহা ভাব এক বার,/ পাঁচজনে পারে যাহা, তুমিও পারিবে তাহা (সংক্ষিপ্ত)।আমাদেরকে পারতে হবে। আমরা যদি প্রতিদিন সকালে ছোট বেলার সেই কবিতাটি মেনে দিন পার করি অবশ্যই আমরা পারবো আর কবিতাটি হল মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘আমার পণ’ সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি,/ সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি। আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে,/ আমি যেন সেই কাজ করি ভাল মনে (সংক্ষিপ্ত)।

আমাদের দেশে শিশুকালে একজন শিশুকে সত্যিকারের মানুষ বানানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু শিশুটির বেড়ে ওঠার সাথে সামঞ্জস্যরেখে শিক্ষা ব্যবস্থা সাজালে শিশুকালে আমরা কি শিখেছি তা মনে থাকতো। আর শুধুমাত্র সেটুকু মনে থাকলেই আমাদের সমাজে অনেক ছোট, ক্ষুদ্র বা মাঝারি অন্যায় অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যেতো। আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি এই যে, সুনির্মল বসুর ‘সবার আমি ছাত্র’ কবিতাটি যে, মানব মেনে চলবে সে মানব থেকে মহামানবে পরিণত হবে… আকাশ আমায় শিক্ষা দিল / উদার হতে ভাই রে,/ কর্মী হবার মন্ত্র আমি/ বায়ুর কাছে পাই রে। পাহাড় শিখায় তাহার সমান-/ হই যেন ভাই মৌন-মহান,/ খোলা মাঠের উপদেশে-/দিল-খোলা হই তাই রে।/ বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর,/ সবার আমি ছাত্র,/ নানান ভাবে নতুন জিনিস/শিখছি দিবারাত্র।

লেখক: জহির ইকবাল সভাপতি, স্বপ্নদেখো সমাজ কল্যাণ সংস্থা,  বিতার্কিক, সমাজ ও সাংস্কৃতিক কর্মী।

SHARE

LEAVE A REPLY