শুরু হতে চলেছে ভারতের আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পের কাজ

তিস্তাআন্তনদী সংযোগ প্রকল্পের আওতায় ৩০টি খাল খনন করে ১৪টি নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ৩৫ মিলিয়ন হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনার জন্য কাজ শুরু করেছে ভারত। এ ছাড়া এ প্রকল্পের আওতায় ৩৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও আসাম এবং বাংলাদেশে এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অভিন্ন নদীতে পানিপ্রবাহ কমে গেলে বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ ভূমি নোনা পানির গ্রাসে চলে যাবে। বাস্তচ্যুত হবে এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ। ভূগর্ভের পানির স্তর নেমে যাবে।

আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পের আওতায় ১৫ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ৩০টি সংযোগ খালের মাধ্যমে ভারতের প্রধান ১৪টি নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করা হবে। প্রকল্পের অধীনে দুটি অঞ্চল রয়েছে; এর একটি হলো পেনিনসুলা। এর আওতায় দক্ষিণ ভারতের গোদাবারী, পেন্নার, কৃষ্ণা, কাবেরী ইত্যাদি নদীর মধ্যে সংযোগ স্থাপনে ১৬টি খাল কাটা হবে। আর দ্বিতীয় অংশের আওতায় হিমালয় অঞ্চলে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ও এদের শাখা নদীতে পানি ধরে রাখার জন্য কৃত্রিম সংরক্ষণাগার তৈরি করা হবে। বাংলাদেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দ্বিতীয় অংশের নদীগুলোর সংযোগ স্থাপনে ১৪টি খাল কাটা হলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলোতে পানিসংকট দেখা দেবে। কারণ বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর পানির ৬০ শতাংশ আসে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র দিয়ে।

হিমালয় অংশে যে ১৪টি সংযোগ খাল কাটার পরিকল্পনা রয়েছে তার মধ্যে আছে কোসি-মেচাই, কোসি-ঘাগরা, গন্ধক-গঙ্গা, ঘাগরা-যমুনা, সারদা-যমুনা, যমুনা-রাজস্থান, রাজস্থান-সাবরমতি, শোন ড্যাম-দক্ষিণের পার্বত্য গঙ্গা (মানস-শংকোস-তিস্তা-গঙ্গা), ব্রহ্মপুত্র-গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র-গঙ্গা (তিস্তার একটি), ফারাক্কা-সুন্দরবন, গঙ্গা-দামোদর-সুবর্ণরেখা ও সুবর্ণরেখা-মহানন্দা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক নদ-নদী নিয়ে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করার আগে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে খোলামেলা আলোচনা হওয়া উচিত। ভারতের প্রখ্যাত পরিবেশবিদ ও গবেষক হিমাংশু ঠাক্কার এ বিষয়ে এক ই-মেইলের জবাবে কালের কণ্ঠকে বলেন, আন্তনদী সংযোগের প্রথম প্রকল্প কেন-বেতোয়া সংযোগটির কাজ এখনো শুরু হয়নি। এটিসহ বাকি ২৯টি প্রকল্পের কাজ শুরুর আগেই এর প্রভাব কী হতে পারে তার ওপর বিস্তারিত গবেষণা হওয়া উচিত। তিনি আরো বলেন, কেন-বেতোয়া সংযোগ খালটি চালু হলে যমুনায় পানিপ্রবাহ কমে যাবে; যার প্রভাব গঙ্গার ওপরও পড়বে। কিন্তু এ নিয়ে কোনো গবেষণা হয়নি।

পানি বিশেষজ্ঞ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক বলেন, তিস্তার ওপারে ভারতের গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এতে উত্তরবঙ্গের নদীগুলো শুকিয়ে গেছে। সেখানে জলজ প্রাণ কমে গেছে।

দুই দেশের পরিবেশবাদীরাই আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পের বিরোধিতা করছেন। কারণ বাংলাদেশ ছাড়াও আসাম, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ এর ফলে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশ : আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পটি নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের তিন গবেষক শ্যারন গুর্দজি কেরি নোলটন ও কোবি প্লাত ‘ইন্ডিয়ান ইন্টার-লিংকিং অব রিভার : এ প্রিলিমিনারি ইভোলিউশন’ শীর্ষক গবেষণায় দেখিয়েছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সুন্দরবন তলিয়ে যাবে। এ ছাড়া ভূগর্ভের পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাবে।

‘ভূতাত্ত্বিক, পরিবেশগত ও আর্থসামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতের আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প’ শীর্ষক আরেকটি গবেষণা করেন যুক্তরাষ্ট্রের লক হ্যাভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান, অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুনিত শ্রীবাস্তব ও ইউনিভার্সিটি অব মিসিসিপি মেডিক্যাল সেন্টারের ফজলে এস ফারুক। তাঁদের গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের ভূমি এত উর্বর হতো না, যদি না ওই এলাকা দিয়ে তিন শর মতো নদ-নদী প্রবাহিত হতো। প্রাকৃতিকভাবে নদ-নদীর পানি সাগরে গিয়ে মেশে। এতে সাগরের নোনা পানি ওপরের দিকে উঠে আসতে বাধা পায়। কিন্তু আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প চালু হলে কলকাতা ও বাংলাদেশের নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ কমে যাবে। এতে সাগরের নোনা পানি সহজেই ঢুকবে। গবেষকরা বলছেন, আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি হারাবে। ফারাক্কা বাঁধের আগে বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো বছরে গড়ে আড়াই বিলিয়ন টন পলি সাগরে বয়ে নিয়ে যেত। এখন এটি কমে দাঁড়িয়েছে দেড় বিলিয়ন টনে। আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এ পলির পরিমাণ আরো কমে যাবে। এতে সাগরের নোনা পানি আরো ওপরে উঠে আসবে। সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাবে।

 

 

SHARE