যশোরে ১৩০ গ্রামের দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি

jessore mapসাম্প্রতিক সময়ের অতিবর্ষণে যশোরে  ১৩০টি গ্রামের দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নিরুপায় মানুষ আশ্রয় নিয়েছে পাকা রাস্তার পাশে ও বেড়িবাঁধে। কোটি কোটি টাকার মাছ ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি ফসলহানিসহ ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক বিপর্যয়ের মর্মস্পর্শী চিত্র দেখা গেছে  যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর, কেশবপুরে । যশোরের ভবদহে পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি সুইস গেট রয়েছে। আশির দশকে এই ভবদহে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হলে ১০ লাখ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর জলাবদ্ধতা নিরসনে পানি উন্নয়ন বোর্ড শত শত কোটি টাকা খরচ করেছে। কিন্তু হঠাৎ করেই চলতি মাসের প্রথম দিকে অতিবর্ষণে ফের ভবদহ ডুবে যায়। অত্র এলাকার পাশ দিয়ে প্রবাহিত কপোতাক্ষ, হরি, শ্রী, টেকা, ভৈরব, মুক্তেশ্বরী নদী পলি পড়ে ভরাট হওয়ার কারণে পানি উপচে গ্রামের পর গ্রাম ভাসিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে ভবদহ সুইস গেটের দুই পাশেও পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি সরছে না। মণিরাপুরের ৪০টি গ্রাম, অভয়নগরের ৫০টি গ্রাম ও কেশবপুরের ৪০টি গ্রাম পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। মণিরাপুরের শ্যামকুড়, চালুয়াহাটি, নেহালপুর ও কুলটিয়া ইউনিয়নের প্রায় সব গ্রামই এখন পানির নিচে। ওই এলাকার সুজাতপুর-কালীবাড়ি পাকা রাস্তায় শত শত মানুষ এসে আশ্রয় নিয়েছে।

মনিরামপুর উপজেলার নেহালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজমুস সাদাত বলেন, ‘কবর দেওয়ারও কোনো জায়গা নেই। আমার ইউনিয়ন পানিতে ভাসছে।’ একই অবস্থা শ্যামকুড় ইউনিয়নের,  এ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ বেড়িবাঁধ ও পাকা রাস্তায় রয়েছে। যশোর-সাতক্ষীরা সড়কের ওপর পাঁচ শতাধিক পরিবার এসে আশ্রয় নিয়েছে।  শ্যামকুড় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মনি জানান, ‘প্রতিদিন তিন-চার ইঞ্চি করে পানি বাড়ছে। ত্রাণ আর গোখাদ্যের খুব অভাব।’ জানা যায়, সাপের উপদ্রব বৃদ্ধি পেয়েছে। গত মঙ্গলবার হেলাঞ্চি গ্রামের দশম শ্রেণির ছাত্রী প্রিয়া, রতনদিয়া গ্রামের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী মুসলিমা, পারখাজুরা গ্রামের আনোয়ারুল ও সর্বশেষ গত শুক্রবার খাটুরাডাঙ্গা গ্রামের গৃহবধূ মনোয়ারা বেগম সাপের দংশনে মারা গেছেন। একই অবস্থা কেশবপুর পৌর এলাকায়। সেখানে সাড়ে ছয় হাজার মানুষের মধ্যে সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষই এখন পানিবন্দি। অন্যদিকে উপজেলার কেশবপুর সদর, পাঁজিয়া ও মঙ্গলকোট ইউনিয়ন পানির ওপর ভাসছে। ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্দশার মধ্যে আছে।

একই অবস্থা অভয়নগর উপজেলার। এ উপজেলার ডাঙ্গামশিয়াহাটী, বেদভিটা, সুন্দলী, ফুলেরগাতি, বাড়ান্দি, দিঘলিয়াসহ প্রায় ৫০টি গ্রামে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক বৈকুণ্ঠ বিহারী রায়  বলেন, ‘কোটি কোটি টাকা দিয়ে নদী খনন করা হয়েছে। পাড়ের মাটি পাড়েই রাখা হয়েছে। সেই মাটি পড়ে নদী ভরে গেছে। কর্মকর্তারা লাভবান হলেও আমরা পাঁচ লাখ মানুষ এখন ক্ষতিগ্রস্ত।’ কৃষক সংগ্রাম সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান বলেন  ভবদহ এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার পাশাপাশি অবাধ জোয়ার আধার চালুর ব্যবস্থা করতে হবে। ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির ছাত্র ব্রিগেডের আহ্বায়ক শ্যামল বিশ্বাস বলেন, ‘এলাকার প্রায় ১০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জলাবদ্ধতার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা মানববন্ধন করেছি।

 এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী বলেন, ‘ভবদহ স্লুইস গেট থেকে শোলগাতির ৯ কিলোমিটার শ্রী ও হরি নদীর চ্যানেল কেটে দিলে পানি নামবে। আমরা সেই চেষ্টা করছি।’ জেলা প্রশাসক ড. হুমায়ুন কবীর জানান, ‘আমি সরেজমিন জলাবদ্ধ এলাকা পরিদর্শন করেছি। অবিলম্বে হরি নদী খনন করে পানি নিষ্কাশনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। কিছু ত্রাণও দিয়েছি। এ অবস্থায় পানিবন্দি মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য আমি সমাজের বিত্তবানদের কাছে জানান ।

SHARE