আউটসোর্সিংএ এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ

0,,1134856_4,00অনলাইন আউটসোর্সিং বিশ্বব্যাপী তরুণ সমাজের কাছে জনপ্রিয় পেশার নাম। বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে এ খাতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে (মার্কেট প্লেস) ৫ লাখের ওপরে বাংলাদেশি আউটসোর্সিংয়ের সঙ্গে জড়িত । আয় হচ্ছে প্রায় ৩০ কোটি মার্কিন ডলার। তবে আয়ের সম্পূর্ণ অংশ ব্যাংকিং চ্যানেলে না আসায় অধিকাংশই থেকে যাচ্ছে হিসাবের বাইরে।

আউটসোর্সিং বলতে বোঝায় মুক্ত পেশা। অর্থাৎ মুক্তভাবে কাজ করে আয় করার পেশা। আর ইন্টারনেট ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজ প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কাউকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়াকে অনলাইন আউটসোর্সিং বলা হয়। যারা আউটসোর্সিংয়ের কাজ করে দেন তাদের বলা হয় ফ্রিল্যান্সার।

আউটসোর্সিং সাইট বা অনলাইন মার্কেট প্লেসে কাজগুলো বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা থাকে। যেমন-ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, নেটওয়ার্কিং ও তথ্যব্যবস্থা (ইনফরমেশন সিস্টেম), লেখা ও অনুবাদ, প্রশাসনিক সহায়তা, ডিজাইন ও মাল্টিমিডিয়া, গ্রাহকসেবা (কাস্টমার সার্ভিস), বিক্রয় ও বিপণন, ব্যবসা সেবা ইত্যাদি। এসব কাজ ইন্টারনেট ব্যবস্থার মাধ্যমে করে দিতে পারলেই অনলাইনে আয় করা সম্ভব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মে মাস পর্যন্ত আউটসোর্সিংয়ে আয় হয়েছে সাড়ে ৯ কোটি ডলারেরও কম। আর বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)-এর হিসাব অনুযায়ী গত অর্থবছরে এ খাতে আয় হয়েছে প্রায় ২৩ কোটি ডলারের ওপরে। অর্থাৎ আউটসোর্সিং থেকে হওয়া আয়ের দুই-তৃতীয়াংশই ব্যাংক হিসাবের বাইরে রয়েছে।

আউটসোর্সিংয়ের অর্থ বাংলাদেশে আসে দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠান দুটি হলো-পেজা এবং পেওনিয়ার। এই প্রতিষ্ঠান দুটিতে হিসাব খুলে আউটসোর্সিং কাজ করে বিদেশ থেকে বাংলাদেশ অর্থ আনা যায়। এ ছাড়া সরকারি মালিকাধীন সোনালী ব্যাংক এই অনলাইনে পেমেন্টের জন্য ‘পেপল’ নামের আর একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। পেপলের সঙ্গে চুক্তি হলে আউটসোর্সিং থেকে আয়  বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন এ খাতের সংশ্লিষ্টরা।

সুত্র জানায়, আউটসোর্সিংয়ের অর্থ পেজা ও পেওনিয়ার-এর মাধ্যমে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে আনা গেলেও, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যে কারণে আউটসোর্সিং পেশায় জড়িতরা বাংলাদেশ থেকে বাইরের দেশে প্রয়োজনীয় অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে মানিলন্ডারিং আতঙ্কে ভোগেন। ফলে আউটসোর্সিংয়ের সঙ্গে জড়িত অনেকে তাদের আয় করা সম্পূর্ণ অর্থ বাংলাদেশে আনছেন না।

তবে পেপল বাংলাদেশে এলে বাইরে থেকে বাংলাদেশে যেমন অর্থ আনা যাবে, তেমনি বাইরের দেশে অর্থ পাঠানোর সুযোগও থাকবে। অনলাইনে পেমেন্টের স্বনামধন্য এ প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশে আসার ক্ষেত্রে চুক্তির প্রধান শর্তই থাকছে এটি। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে বাইরের দেশে ইচ্ছামাফিক অর্থ পাঠানোর সুযোগ নেই। ফলে শেষ পর্যন্ত পেপলের সঙ্গে চুক্তি হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

এদিকে আউটসোর্সিংয়ের অর্থ বাংলাদেশে ব্যাংকিং চ্যানেলে আনার পরিমাণ বাড়াতে সম্প্রতি একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঘোষণা ছাড়াই ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দেশে আনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে ঘোষণা ছাড়াই সর্বোচ্চ ২ হাজার ডলার দেশে আনা যেত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আউটসোর্সিং থেকে বাংলাদেশের আয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয় ৭ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ডলার হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আউটসোর্সিং থেকে আয় বেড়েছে ২ কোটি ১০ লাখ ডলার। আয় বাড়ার এ হার ২৮ শতাংশের ওপরে।

আউটসোর্সিং থেকে বাংলাদেশের এ আয় বেশ ধারাবাহিকভাবেই বেড়েছে। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে আসা এ খাতের আয় ছিল মাত্র ৬৫ লাখ ডলার। ২০১০-১১ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৮ লাখ ডলার। ২০১১-১২ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে হয় ২ কোটি ১৯ লাখ ডলার।

আউটসোর্সিং থেকে আয় বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ২০১২-১৩ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয় ৩ কোটি ২৮ লাখ ডলার। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আয় হয় ৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলার। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এ খাতের আয় প্রায় ৩ কোটি ডলার বেড়ে হয় ৭ কোটি ৩৯ লাখ ডলার।

আউটসোর্সিংয়ের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত অন্যান্য কম্পিউটার সেবা থেকেও আয় বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মে মাস পর্যন্ত কম্পিউটার সেবার মাধ্যমে বাংলাদেশ ১৩ কোটি ৬৪ লাখ ডলার আয় করেছে। আউটসোর্সিং (ডাটা প্রসেসিং অ্যান্ড হোস্টিং সার্ভিস), পরামর্শ সেবা এবং কম্পিউটার সফটওয়্যার রফতানি‒এই তিন খাত থেকে এ আয় হয়েছে।

আগের অর্থবছর ২০১৪-১৫ এই তিন খাত থেকে আয় হয় ১৩ কোটি ২৬ লাখ ডলার। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১২ কোটি ৫৫ লাখ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১০ কোটি ১৬ লাখ, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৭ কোটি ৩ লাখ, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৪ কোটি ৫৩ লাখ এবং ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৩ কোটি ৫৩ লাখ ডলার কম্পিউটার সেবা থেকে আয় হয়।

এর মধ্যে শেষ দুই বছর সফটওয়্যার রফতানি থেকে আয় কমেছে। সর্বশেষ অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত সফটওয়্যার রফতানি করে আয় হয়েছে ৩ কোটি ২৯ লাখ ডলার। যা আগের অর্থবছরে (২০১৪-১৫) ছিল ৪ কোটি ৭৮ লাখ ডলার। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. মাসুদ বিশ্বাস  বলেন, আউটসোর্সিং থেকে বাংলাদেশের আয়ের পরিমাণ বেড়েছে। এ খাত থেকে অর্জিত অর্থ বাংলাদেশে আনতে আন্তর্জাতিক অনলাইন পরিশোধ মাধ্যম পেপলের সঙ্গে সোনালী ব্যাংক চুক্তি করার চেষ্টা করছে। এ চুক্তি হয়ে গেলে আশা করা যায় আউটসোর্সিং থেকে আয় অনেক বেড়ে যাবে।

এদিকে বেসিস বলছে, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, মোবাইল গেমিং, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন থেকে শুরু করে আইটি সেক্টর, ফ্রিল্যান্সিং-সব মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ৪০ কোটি ডলার আয় হচ্ছে। এর মধ্যে বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) থেকে গত বছর প্রায় ১৩ কোটি ডলার আয় হয়েছে। এ ছাড়া ফ্রিল্যান্সার আয়ের সঠিক হিসাব না থাকলেও তাদের আয় কমবেশি ১০ কোটি ডলার।

এ সংগঠনটির মতে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে প্রযুক্তি সেবা রফতানি তেমন না বাড়লেও আউটসোর্সিংয়ের কাজ প্রসারিত হয়েছে ব্যক্তি পর্যায়ে। এ খাতে প্রযুক্তি রফতানির অর্থ বাংলাদেশে নিয়ে আসার বৈধ কোনো পথ নেই। শুধু ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আসা অর্থের হিসাব দিচ্ছে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো। এর বাইরে কয়েক লাখ তরুণ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কাজ করে বিভিন্ন উপায়ে অর্থ আনছেন। এর পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি ডলার। ব্যক্তি পর্যায়ে প্রযুক্তি সেবায় বিপুল পরিমাণ আয় হলেও তা ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে আসছে না।

গত ২৬ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, বাংলাদেশে এখন কনসালটেন্সি ও আউটসোর্সিং খাতে ৩০ হাজার লোকবল কাজ করছে। এ খাতে বছরে আয় হয় ১৮০ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ১৮ কোটি ডলার। কিন্তু সারা পৃথিবীর বাজার হচ্ছে ৬শ’ বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে ভারত একাই ১০০ বিলিয়ন ডলার আয় করছে। এরপর ফিলিপাইন ১৬ বিলিয়ন ডলার এবং শ্রীলঙ্কা ২ বিলিয়ন ডলার আয় করছে। আমাদেরও অনেক সুযোগ রয়েছে।

পলক বলেন, বর্তমান সরকার আইসিটি ব্যবসায়ীদের জন্য ট্যাক্স কমিয়েছে। আউটসোর্সিংয়ের জন্য যারা প্রতিষ্ঠান গড়বেন, সে স্পেসের জন্য ট্যাক্স নেওয়া হবে না। এ ছাড়া ২০২১ সালের মধ্যে এ খাতে ১ বিলিয়ন ডলার আয় এবং ১ লাখ কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। গত বছর এ খাতে আয় ছিল ১৩০ মিলিয়ন ডলার। এ বছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার আয় বেড়েছে।

যোগাযোগ করা হলে বেসিস-এর ভাইস-প্রেসিডেন্ট রাশেদুল  বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকে আউটসোর্সিং থেকে আয়ের যে তথ্য আছে, প্রকৃত আয় তার থেকে অনেক বেশি। শুধু ব্যাংকিং চ্যানেলে যে আয় দেশে আসছে, তাই বাংলাদেশ ব্যাংকে রেকর্ডভুক্ত হচ্ছে। এর বাইরে আয়ের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে নেই।

তিনি বলেন, বড় বড় কোম্পানিগুলোর আউটসোর্সিংয়ের টাকা বাংলাদেশে আসে না। এদের মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা একাই আউটসোর্সিং থেকে ১০০ মিলিয় ডলার আয় করে। কিন্তু তারা ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা দেশে আনছেন না। কারণ অর্থ একবার দেশে আনার পর তা আবার বাইরের দেশে পাঠাতে গেলে মানিলন্ডারিংয়ের শঙ্কা থেকে যায়। ফলে তারা আউটসোর্সিং থেকে আয় করা অর্থ বাংলাদেশে না এনে, বাইরের দেশের ব্যাংকেই রেখে দিচ্ছেন। তবে তারা যাতে দেশে টাকা আনেন সে বিষয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছি।

SHARE