ভবদহের দুঃখগাথা

vobodohoভবানীপুরের ভব আর দহখোলার দহ দুজন মিলেই হয়েছিল ভবদহ । শ্রী বা হরি নদী, হামকুড়া নদী ও গ্যাংরাইল নদীর মোহনা হচ্ছে ভবদহ । যখন তিনটি নদীর মিলন ঘটানো হয়েছিল তখন সেখানে গভীরতা ছিল ১৩৯ ফুট । আজ সেখানে গভীরতা তো দুরের কথা নদীই নেই বললে চলে, নদী হয়ে গেছে খাল । নদীর নাব্যতা নেই এবং নদীকে দখল করেছে নদী খেকোরা । এমনকি ভবদহ কলেজটিও নদীর জায়গায় স্থাপিত । যার ফলে ভবদহে আজ ২১ লক্ষ মানুষের কান্না ।

প্রতিবছর পদ্মা, মেঘনা, বহ্মপুত্র নদী বেয়ে আমাদের দেশে ১২০ কোটি মে. টন পলি আসে । সাথে রয়েছে সমতল ভুমির পলি এবং ভারত থেকে বেয়ে আসা বঙ্গপোসাগর হয়ে জোয়ার ভাটার ম্যাধ্যমে আমাদের দেশে পলি এসে জমা হয় । ফলে যে পরিমান পলি জমা হয় তা দিয়ে প্রতিবছর একটি উপজেলার আয়তনের নতুন ভুমির জন্ম হয় । হয়ত ভাবছেন তাহলে তো আমাদের দেশের আয়তন বৃদ্ধি পাচ্ছে? হ্যা আসলেই আয়তন বাড়ছে । পরিসংখ্যান বলছে প্রতিবছর আমাদের দেশে ৮৬ বর্গকিলোমিটার আয়তন বাড়ে আর ৭০ বর্গকিলোমিটার নদীর ভাঙ্গনে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায় ।

আন্তর্জাতিক ৫৭টি নদীর মধ্যে ভারত হয়ে বাংলাদেশে এসেছে ৫৪ টি ৩টি এসেছে মায়ারমার হয়ে । ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসা প্রায় সব নদীতে ভারত কতৃক বাধ ও ব্যারেজ নির্মান করে একদিকে উত্তরবঙ্গকে মরুভুমিতে পরিণত করার বন্দোবস্ত করা হয়েছে অপর দিকে দক্ষিণ অঞ্চলকে প্লাবিত করার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া চলছে । আজ বাংলাদশের অর্ধেক নদী মারা গেছে, বিপন্ন হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ, নষ্ট হয়ে গেছে প্রানী-বৈচিত্র্য ।

গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধসহ অভিন্ন নদ-নদীতে বাঁধ নির্মাণ করে একপক্ষীয়ভাবে পানি প্রত্যাহার, ওয়াপদা কর্তৃক বাঁধ, স্লুইচ গেট, রেগুলেটর নির্মাণ ও তাদের অপরিকল্পিত প্রকল্প, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ যেমন ব্রিজ-কালভাট, অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের । নদী দখল ও নদী ব্যবস্থাপনার অভাবসহ নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহকে ব্যাহত ও ভূমি গঠন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়াসহ নানা কারণে সারাদেশসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদী ভরাট হয়ে বন্যা, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা, আর্সেনিক দূষণসহ নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। চলতি বছর অতি বৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়া সত্ত্বেও ওয়াপদা কর্তৃপক্ষ ভবদহের স্লুইচগেটসহ সমগ্র এলাকার স্লুইচগেট খোলার ব্যবস্থা করেনি। তেমনি আপার ভদ্রা-হরিহর নদীর (কেশবপুরের আলতাপোল-বালিয়াডাঙ্গা ব্রীজ নির্মানকালে) ক্রাসড্যাম উচ্ছেদ না করায় নদীর ভাটিতে ৫ বর্গমাইল এলাকা ৮/৯ ফুট পলি পড়ে নদীগর্ভ ভরাট সমস্যার সমাধান করেনি। পাশাপাশি ভবদহ থেকে ভদ্রাসহ নিষ্কাশন চ্যানেলগুলির পলি অপসরণের প্রকল্প কার্যকরি করেনি। প্রশাসন নদী-খাল থেকে পাটাসহ পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা অপসারণে নিরব থেকেছে। সঙ্গত কারণে অতি বৃষ্টি এবং ফারাক্কা বাধ খুলে দেওয়ায় বিশাল জলরাশি সাগর ও নদ-নদী উপচে বন্যা ও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করেছে। সে কারণে যশোর জেলার সদর, শার্শা, মনিরামপুর, অভয়নগর, কেশবপুর, ঝিকরগাছা ও চৌগাছা উপজেলার প্রায় ২১ লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। যার অংশ হিসেবে সাপের কামড়ে ১২ জন এবং পানিতে ডুবে ৪ শিশু মারা গেছে। ওষুধের অভাবে সরকারি হাসপাতালে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসা হচ্ছে না। আশ্রয়, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট ও পানিবাহিত রোগের বিস্তার চরম আকার ধারণ করেছে। পয়ঃনিষ্কাশন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তিন শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়া বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। মণিরামপুর, কেশবপুর ও অভয়নগর উপজেলার ২৫০টিরও বেশি গ্রামে বাড়ির আঙিনায় এখন হাঁটুপানি। কাঁচা ঘর-বাড়ি ভেঙ্গে পড়ছে। সড়ক, উঁচু স্থান, গাছে মাচা তৈরি করে ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি মানুষ আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। আবার অনেকে এলাকা ছাড়া হয়েছে। যারা টিকে আছে তারা গৃহপালিত পশু ও সাপের সাথে বাস করতে বাধ্য হচ্ছে। এলাকায় পুশুর আবাসন ও পশুখাদ্য সংকট প্রকট হয়েছে। একই পানিতে রান্না, খাওয়া ও পয়ঃনিষ্কাশন এবং পানির বিষাক্ততায় মানুষ ও গৃহপালিত পশু পানি বাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, মানুষ বা কোন প্রাণীর দাফন/সৎকারের জায়গা অবশিষ্ট নাই। প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমির ফসল ও ৪ হাজার মৎস্য ঘের ভেসে গেছে। সমগ্র ক্ষয়ক্ষতি হাজার হাজার কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্থরা জীবিকার তাগিদে পানির দামে তাদের সহায়-সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। বিগত কয়েক বছরে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকার প্রায় ৯ লক্ষ মানুষ এলাকা ছাড়া হয়েছে। চলতি বছর এই হার বহুগুন বাড়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছে। আবাসন, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য নতুন ভাবে দাঁড় করানোর বিষয়ে চরম শঙ্কার মধ্যে দিনাতিপাত করছে।

কিছু মহল কৃষি ধ্বংসের চক্রান্তসহ স্বীয় স্বার্থে দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশকে ধ্বংস করে চলেছে। যার অংশ সমস্যার সমাধানের নামে অপরিকল্পিত প্রকল্প তৈরি করে সমস্যাকে বৃদ্ধি ও লুটপাটের পথ প্রশস্থ করা। যে কারণে অদ্যবধি তারা যতগুলো প্রকল্প করেছে তা দ্বারা সমস্যার সমাধান না হয়ে জলাবদ্ধতাকে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করছে এবং ব্যাপক ঋণের দায় চেপেছে জনগণের ঘাড়ে। ওয়াপদা কর্তৃপক্ষ ও তার পক্ষের প্রচারণাকারীরা বর্তমান জলাবদ্ধতা সমস্যা সৃষ্টির কারণ হিসেবে বিল কপালিয়ার অপরিকল্পিত টিআরএম প্রকল্পসহ লুটপাটের অন্যান্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড বর্তমানে দুটি খনন যন্ত্র দিয়ে শ্রী ও হরিহর নদী খনন করছে। খননকৃত পলি নদীবক্ষেই রাখায় তা পুনরায় নদীগর্ভেই ফিরে যাচ্ছে। তারা বিল-কেদালিয়া, বিল বকরসহ ৫৭ ও ২৭ বিলের ক্ষতিগ্রস্থ মানুষকে বিল কপালিয়াবাসীর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। তারা জলাবদ্ধ মানুষকে বিভক্ত করে তাদের চক্রান্তের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তৎপর রয়েছে। এ কথা সহজে অনুমেয় যে, বিল কপালিয়ার মত ছোট্ট ও উঁচু বিলে এবং শ্রী বা হরি নদীর পানি ধারন ক্ষমতা সর্বোচ্চ কত হতে পারে তা হিসেব করলে এ কথা সর্বজন স্বীকৃত যে, চলতি মৌসুমের অতিবর্ষন ও ভারত থেকে আগত জলরাশি ধারণ ক্ষমতা সৃষ্টি হওয়ার কোন যুক্তি সঙ্গত কারণ নাই। অথচ ‘যশোর জেলাধীন ভবদহ ও তৎসংলগ্ন বিল এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরন প্রকল্প (১ম পর্যায়)’ প্রকল্পের বিল কপালিয়ার টিআরএম ব্যতিত অন্যান্যগুলি বাস্তবায়ন করার সুযোগ থাকলেও তা তারা করেনি। ২০১০ সালে প্রদত্ত আইডব্লিউএম এর দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা তারা মানছে না। যার প্রমাণ আপার ভদ্রা নদীর বিল বুড়–লিতে ২০১২-১৮ সাল পর্যন্ত, শ্রী বা হরি নদীর বিল কপালিয়াতে ২০১৩-১৯ সাল পর্যন্ত, হামকুড়া নদীর বিল মধুগ্রামে ২০১৪-২০ সাল পর্যন্ত ও গ্যাংরাইল নদীতে গ্যাংরাইল বেসিন ফাস্ট কম্পার্টমেন্ট নামে ২০১৪-২০ সাল পর্যন্ত টিআরএম প্রকল্প করার কথা। কিন্তু তারা অন্য কোথাও না যেয়ে বিল কপালিয়া নিয়ে সংকট তৈরী করে চলেছে। আইডব্লিউএম ২০৪৭ সাল পর্যন্ত আপার ভদ্রা, শ্রী/হরি, হামকুড়া ও গ্যাংরাইল নদীতে পর্যায়ক্রমে টিআরএম প্রকল্পের সিকোয়েন্স তৈরি করেছে। একদিকে তাদের এই প্রকল্প অপরিকল্পিত অপরদিকে দীর্ঘসূত্রিতায় জর্জরিত। সংগত কারণে জলাবদ্ধতা সমস্যা ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল পলি সক্রিয় ও জোয়ার-ভাটা বিধৌত অসংখ্য নদ-নদীর সমন্বয়ে গঠিত। জলাবদ্ধতা ও পলি অবক্ষেপন এই অঞ্চলের প্রধান সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত। এই সমস্যা সমাধানে কৃষক সংগ্রাম সমিতি অবাধ জোয়ার-ভাটা সৃষ্টিসহ পাঁচ দফা দাবী বাস্তবায়নে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছে। (১৯৮৮ সালের ২২ জুলাই ঐতিহাসিক ডহুরী আন্দোলন, ১৯৯০ সালে ১৮ সেপ্টেম্বর খুলনার বিল ডাকাতিয়া, বিল বুড়–লি-বিল পাথরা, বিল পাঁজিয়াসহ যশোর-খুলনার অসংখ্য বিলে ওয়াপদা বাধ উচ্ছেদ করে জোয়ার-ভাটা সৃষ্টি করে। সর্বশেষ ১৯৯৭ সালের ২৯ অক্টোবর যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার আগরহাটি-ভায়না বিলে ওয়াপদার বিরুদ্ধে হাজার হাজার কৃষক-জনগণ কৃষক সংগ্রাম সমিতির নেতৃত্বে জোয়ার-ভাটা করে। এর সাফল্য ওয়াপদাই শিকার করে জনগণের এই অভিজ্ঞতাকে তাদের প্রথম টিআরএম প্রকল্প তথা জোয়ারাধার-১ (টিবি-১) হিসাবে স্বীকৃতি দেয়।

প্রকৃত পক্ষে নদী মুক্ত না করে কখনোই জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব না । এই সাধারন কথাটা কোন বুদ্ধিজীবী বা নামধারী বিবেক তাদের মুখে শোনা যায় না । যার ফলে ভবদহ অঞ্চল নিয়ে অজ্ঞতা আমাদের মাঝে রয়ে গেছে । আর অসৎ ব্যাক্তির মনে কখনোই সৎ চিন্তা আসেনা, ফলে এই অঞ্চলকে বাঁচাতে হলে আগে সঠিক তথ্যগুলো জানতে হবে এবং জাগাতে হবে সমাজকে । আজ যে বিপদ ভবদহে কাল সে বিপদ আমার ঘরে আসবে ! আর এটাই সত্য ।

তথ্যসুত্র সংগ্রহ ঃ বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি, যশোর জেলা শাখা ।

SHARE