‘শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক’ তরুণদের স্বপ্ন ও আগামীর বাংলাদেশ

ওয়াসিম হোসেন:  তথ্যপ্রযুক্তি আজ বিশ্বের প্রতিটি মানুষের সাথে মিশে গেছে। বিশ্বের শীর্ষ সব ধনী ব্যক্তি তথ্য প্রযুক্তিরেই কর্মী। বিশ্ব আজ পরিণত হয়েছে সত্যিকারের গ্লোবাল ভিলেজে। তাই সমৃদ্ধময় আগামীর বাংলাদেশ গড়তে তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ ছাড়া কোন বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার সেই লক্ষে কাজ করছে। নেওয়া হয়েছে একাধিক উদ্যোগ। জেলায় জেলায় গড়ে তোলা হচ্ছে আইটি পার্ক। যশোরের ‘শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক’ তাদের অন্যতম। যে পার্ক ঘিরে তরুণরা যেমন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন, তেমনি দেশপ্রেমিক প্রতিটি মানুষের সামনে ভেসে উঠছে উন্নত বাংলাদেশের চিত্র।
বর্তমান বিশ্বে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আউটসোর্সিংয়ের অবস্থান দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বিশ্বে সুনাম অর্জন করেছে। আউটসোর্সিংয়ে বিশ্বে শীর্ষ দশ’র মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। যে সব কোম্পানি আউটসোর্সিংয়ের জন্য লোক খোঁজে, তাদের অন্যতম পছন্দের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৫ ভাগই তরুণ। যাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তুলতে পারলে আউটসোর্সিং হতে পারে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত করার অন্যতম উপায়।

সরকারি উদ্যোগ
‘বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ আগামী তিন বছরে এক লাখ দক্ষ মানব সম্পদ তৈরির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ইতিমধ্যে এলআইসিটি প্রকল্পের আওতায় ৪৪ হাজার দক্ষ মানব সম্পদ গড়তে প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। এদের মধ্যে ১০ হাজার বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিতে স্নাতক অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীকে ‘টপআপআইটি’ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আর নন-আইটি বিষয়ে ২০ হাজার শিক্ষার্থীকে দেওয়া হচ্ছে ‘ফাউন্ডেশন’ প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ শেষে অন্তত ৬০ শতাংশের কর্মসংস্থান হবে দেশ-বিদেশে। এছাড়াও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অর্থ আয়ের সুযোগ করে দেয়ার জন্য ১০ হাজার তরুণ-তরুনীকে উন্নত প্রশিক্ষণে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্পের অধীনে আউটসোর্সিংয়ের প্রশিক্ষণ নিয়ে ৫৫ হাজার ফ্রিল্যান্সার তৈরি হবে। মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলে বিষেশায়িত ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও সরকারি উদ্যোগে ই-ল্যার্নিং এর মাধ্যমে ঘরে বসে প্রশিক্ষণের জন্য বেশকিছু ই-শিক্ষা প্লাটফরম গড়ে তুলছে সরকার।’ বলছিলেন বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসনে আরা বেগম। ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সারা দেশে বিভাগীয় ও জেলা শহরে হাইটেক পার্ক (সফটওয়্যার পার্ক) নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বর্তমানে ২৮টি হাইটেক পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে গাজীপুর কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাই-টেক পার্ক, যশোরে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, সিলেট ইলেকট্রনিক সিটি, রাজশাহীতে বরেন্দ্র সিলিকন সিটি ও সেভেন আইটি ট্রেনিং এন্ড ইনকিউবেশন হাইটেক পার্কের কাজ চলমান। নির্মাণ শেষে চালু হয়ে গেছে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে জনতা টাওয়ারে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক। যশোরে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের জায়গা বরাদ্ধ দেওয়া শুরু হয়েছে। দ্রুতই চালু হবে এই পার্কটি।’
আইটি খাতের সম্ভাবনা
তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি বড় সেক্টর বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও)। বাংলাদেশে বিপিও খাতে যারা কাজ করেন তারা অধিকাংশই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর এ ক্ষেত্রটি অত্যান্ত সম্ভাবনাময়। বর্তমানে ব্যক্তি উদ্যগে ছয় লাখ বাংলাদেশি এ পেশায় জড়িত। আগামী ২০২১ সালের মধ্যে ২০ লাখ তরুণ-তরুণীকে তথ্যপ্রযুক্তির কাজে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার । ইতিমধ্যে সফটওয়্যার ডেভলপমেন্ট, বিজনেস প্রসেসিং, কল সেন্টার, রিচার্স এন্ড ডেভলপমেন্ট, মোবাইল অ্যাপস, গেমস ডেভলপমেন্টসহ তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যেখানে তৈরি পণ্য দেশে ব্যবহারের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির সেবা ও পণ্য রপ্তানি করে আয় হচ্ছে বিপুল পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা। বিশ্বে বর্তমানে বছরে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজার রয়েছে আউটসোর্সিংয়ে। বাংলাদেশ এ খাত থেকে ২০১৫-১৬ অর্থ প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার আয় করছে। আর সফটওয়ার রফতানি করে আয় হয়েছে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি খাতের স্থানীয় বাজার রয়েছে আরো প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের। ২০১৮ সালে এর পরিমাণ হবে এক বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালে যার পরিমান বেড়ে দাঁড়াবে পাঁচ বিলিয়ন ডলার।
‘শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক’
যশোরে প্রায় সাড়ে ৯ একর জমির ওপর ২৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক। তৈরী হয়েছে ১২ ও ১৫ তলাবিশিষ্ট দুইটি ভবন। এখানে থাকছে ফাইবার অপটিক কানেক্টিভিটি। নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুতের সাপ্লাইয়ের জন্য ৩৩ কেভিএ বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন ও দুই হাজার কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর। পার্কের মধ্যে পাঁচ একরের একটি বিশাল জলাধার থাকছে। যেখানে স্বচ্ছ পানিতে খেলবে নানা প্রজাতির মাছসহ জলজ প্রাণী। থাকবে দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। দেশের আইটি খাতকে সমৃদ্ধ ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ‘শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক’ স্থাপন করছে সরকার। এ ক্ষেত্রে যশোরে আইটি সফটওয়্যার-সংক্রান্ত জ্ঞানভিত্তিক শিল্প স্থাপনসহ নানা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের ম্যাধ্যমে ২০ হাজার আইটি কর্মী ও প্রায় ৩০ হাজার সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। প্রসারিত হবে দেশের আইসিটি, ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং খাতের সম্ভাবনার দ্বার। ইতিমধ্যে পার্কটি চালু প্রকৃয়া শুরু হয়েছে। হোসনে আরা বেগম জানান, শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের প্রতি বর্গফুট ১০ টাকা ভাড়া ও ২ টাকা সার্ভিস চার্জে তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানকে জায়গা বরাদ্ধ দেওয়া হচ্ছে। সফটওয়্যার ডেভলপমেন্ট, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং, কল সেন্টার, রিচার্স এন্ড ডেভলপমেন্ট ও স্টার্টআপ উদ্যক্তাদের জন্য হাইটেক পার্কে জায়গা বরাদ্ধ দেওয়া হবে। বর্তমানে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ ১১ টি প্রনোদনা প্যাকেজ প্রদান করছে।
যেভাবে যোগ দিতে পারেন শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে
যে কোন আইটি প্রতিষ্ঠান শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। তবে প্রতিষ্ঠিত কোন আইটি প্রতিষ্ঠান না থাকলেও চলবে। এজন্য আপনার উদ্ভাবনী চিন্তা (স্টার্টআপ কোম্পানি) তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবসা কিংবা সেবায় পরিনত করার পরিকল্পনা থাকতে হবে। এই স্টার্টআপ কোম্পানির নামে স্পেস বরাদ্ধ নিয়ে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবসায় নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারবেন।
স্টার্টআপ কোম্পানি
জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের সাথে পৃথিবীর প্রায় ২০০ কোটি মানুষ আজ পরিচিত। ভিডিও দেখার ইচ্ছে হলেই অনেকে ইউটিউবে ঢু মারেন। কোন কিছু খোজা বা জানার জন্য সাহায্য নেন গুগলের। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও গুগল, ইউটিউব বা ফেসবুক ছিল না। যখন এই অনলাইন পোর্টালগুলোর যাত্রা শুরু হয়, তখন তারা ছিল এক একটি ‘স্টার্টআপ কোম্পানি’। স্টার্টআপ হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে একটি উদ্ভাবনীমুলক ব্যবসা বা সেবা। স্টার্টআপ এমন একটি উদ্যোগ যা ইউনিক ও দ্রুত বর্ধনশীল ব্যাবসা বা সেবা। যা একটি বাজার তৈরী বা পূরণ করার লক্ষ্যে কাজ করে। এটি পরিবর্তনযোগ্য ব্যবসায়িক মডেল। এমন যে কোন একটি ব্যবসায়িক মডেল হাজির করে যশোর ‘শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক’র সাথে যুক্ত হওয়া যাবে।
কর্মী হিসেবে
কম্পিউটার বিজ্ঞান কিংবা কোডিং জানেন না এমন লোকও যে কোন একটি সহজ-সরল কাজে দক্ষ হয়েই পার্কে দেশি বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানিতে কাজ করার সুযোগ পেতে পারেন। এজন্য তাকে কম্পিউটারে ডাটা এন্ট্রি, অফিস প্রোগ্রামের মতো যে কোন একটির উপর দক্ষতা অর্জন করতে হবে। এছাড়াও নন-টেকনিক্যাল কাজেও অসংখ্য পদের সৃষ্টি হবে। সব মিলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ তাদের শ্রম প্রয়োগের নুতন ক্ষেত্র পাবেন শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে।

তথ্য সূত্র:
১। বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ওয়েবসাইট।
২। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের ওয়েবসাইট।
৩। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ’র ওয়েবসাইট।
৪। বেসিসের ওয়েবসাইট ও প্রকাশনা।
৫। বাংলাদেশ রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো ওয়েবসাইট ।

SHARE