আলোর প্রসব বেদনা-১
সুজন দেবনাথ (অব্যয় অনিন্দ্য)

তীব্র ঠাণ্ডা পড়েছে। দূরের পাহাড়ে তুষারও জমতে শুরু করেছে।
শহরের আবছা অন্ধকার পথে চ্যাপ্টা চেহারার একটি বেঁটে যুবক বাঁকা হয়ে হাঁটছে। তার হাঁটার ভঙ্গিটি হাঁসের মত। দুই পা দুই দিকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেয় আর সেই সাথে সারা শরীর ঝুঁকে পড়ে। একেবারে পুরোপুরি হংস-চলন।

এই ভয়ংকর ঠাণ্ডার মধ্যেও হংস-চলন যুবকটির পা খালি। জুতা, স্যান্ডেল কিছুই নেই। এক টুকরো সাদা কাপড় শরীরের দুই দিকে আলুথালুভাবে কোনরকমে ঝুলে রয়েছে। ভাবটা এমন যে, এই কাপড়টুকুও না পরতে হলে তার অনেক ভাল লাগতো। যুবকটি আপন মনে বিড়বিড় করে কি যেন বলছে। হয়তো যে কাপড় আবিষ্কার করেছে, মনে মনে তাকে গালি দিচ্ছে।

তীব্র ঠাণ্ডার মধ্যে উদাস ভাবে হাঁটছে আর সুখী সুখী মুখে রাস্তার দুই দিকে তাকাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার ভেতর খালি পায়ে, একটা মাত্র তেনা-কাপড় জড়িয়ে হাঁটাটা সে ভীষণ উপভোগ করছে। যেন সাধারণ দুঃখ-কষ্টকে হাসি মুখে উড়িয়ে দেয়ার মত আনন্দের জিনিস পৃথিবীতে আর নেই।

যুবকটির চেহারাও অদ্ভুত। বড় বড় চোখ, থ্যাবড়ানো নাক। এই অঞ্চলের মানুষ তাঁদের চেহারা নিয়ে ভীষণ গর্ব করে। তাদের গড়ন নাকি একেবারে দেবতার মত। তাদের চোখ, নাক, মাথা সব কিছু একেবারে জ্যামিতির স্কেল দিয়ে মেপে মেপে বানানো। সেই তুলনায় এই যুবকের চেহারা একেবারেই বদখত। তার নাক, চোখ, মাথা, উচ্চতা কোন কিছুরই কোন হিসাব মিলে না। তাকে বানানোর সময় বিধাতা মনে হয় জ্যামিতির সূত্র ভুলে গিয়েছিলো। সে এখানে ময়ূর সভায় কাক পক্ষী।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো – এই কাকপক্ষীটিকে যে একবার দেখে, সে আর ভুলতে পারে না। সে একেবারে অনন্য। তার মত আর কেউ নেই। এই শহরের পথে অনেক মানুষ। সারাক্ষণই ভিড় লেগে আছে। সেই ভিড়ের মধ্যেও তাকে একেবারে ভিন্নভাবে চোখে পড়ে। তার সব কিছুই অন্যদের থেকে আলাদা। এমন হংস-চলন এই শহরে অন্য কারো নেই। এই চলার ভঙ্গিটি প্রথম দেখলে সবাই হো হো করে হেসে ওঠে। সেই হাসির সাথে হাঁটার ভঙ্গি আর কিম্ভূতকিমাকার চেহারাটা মিলে লোকটার একটা ছবি তৈরি হয়। একেবারে আলাদা সেই ছবিটা চিরকালের মত মনে রয়ে যায়। তাকে সবাই একবাক্যে চিনে। অনেক দূর থেকে এক নজরেই সবাই বলে দেয় – সে আসছে।

যুবকটির নাম সক্রেটিস। এই তীব্র শীতের মধ্যে এমনভাবে চলাফেরা করা শুধু সক্রেটিসের পক্ষেই সম্ভব। উদ্ভট স্বভাবের জন্য সমবয়সী ও ছোটরা তাকে ভীষণ পছন্দ করে। তাদের কাছে সে একটা বিশেষ কিছু। তার মধ্যে যে একটা চটক আছে, তারা সেটা উপভোগ করে। কিন্তু ছেলেদের পিতা এবং শহরের বয়স্ক মানুষেরা সক্রেটিসের এমন উদ্ভট স্বভাব মোটেই সহ্য করতে পারে না। তারা বলে, সব এই চালাক লোকটির ভড়ং। সং সেজে সবার নজরে থাকতে ইচ্ছে করেই সে এমনটা করে। ওর আর কোন যোগ্যতা নেই, শুধুই ভড়ং-ভাড়ং। সক্রেটিসের থেকে সন্তানদের দূরে রাখা তাদের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত জরুরি। শহরের বৃদ্ধদের মধ্যে একটা জনপ্রিয় শ্লোগান হলো – সক্রেটিস যুবকদের জন্য ক্ষতিকর।

সন্ধ্যার পর এখানে সবাই মশাল নিয়ে চলাফেরা করে। কিন্তু সক্রেটিস তো আলাদা, তার মশাল দরকার নেই। ভাব-সাবে মনে হয় – অন্ধকারেও সে চোখে দেখতে পায়। চোখে দেখুক আর নাই দেখুক, অন্ধকারের ভেতরেই সে তার বন্ধুদের ঠিকই খুঁজে নিলো। তীব্র ঠাণ্ডার মধ্যে রাস্তার পাশে ঘাসের উপর পা ছড়িয়ে বসে আছে চার-পাঁচটা তার বয়সী যুবক। সক্রেটিস তাদের সাথে যোগ দিলো।

যুবকেরা আলাপ করছে। আড্ডার বিষয় পৃথিবীর মধ্যে কোন শহর তাদের সবচেয়ে প্রিয়। এই আড্ডার যুবকদের মধ্যে সক্রেটিসের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুর নাম চেরোফোন। সে বললো, আমি প্রতি গ্রীষ্মের শুরুতে ডেলফিতে যাই। পাহাড়ের উপর একেবারে চোখ জুড়ানো ডেলফির এপোলো মন্দির। সেই মন্দিরের পুরোহিত মানুষের ভবিষ্যৎ বলতে পারে, কিছু জানার দরকার হলেই আমি ডেলফিতে ছুটে যাই। ডেলফিই আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।

আরেকজন বললো, আমি গত বছর স্পার্টাতে গিয়েছি। স্পার্টার লোকজন সব ভয়ংকর যোদ্ধা, ওরা ছোটবেলা থেকেই সবাই যুদ্ধ শিখে। বড় বড় চুল রাখে। বেশ সুন্দর দেখতে সব স্পার্টানদের। এক একজন একেবারে একিলিস। তবে পুরুষরা যেমন তেমন, স্পার্টার মেয়েদের দিকে তাকালে চোখ আর সরে না। সবাই ট্রয় যুদ্ধের সেই হেলেন। বিশ্বাস করতে পারবে না – আমি এখনো চোখ বুজলেই দেখতে পাই। আহা, কেমন এক একজন অপ্সরী, কেমন এক একজন হেলেন। আমার খালি স্পার্টা যেতে ইচ্ছা করে।

আরেকজন বললো, সেই যেখানে অলিম্পিক খেলা হয় সেই পাহাড়টাই আমার সবচেয়ে প্রিয় স্থান। আমি ভালোবাসি বীরদের লড়াই। আর সভ্য মানুষের মাঠের লড়াই দেখতে অলিম্পিকের চেয়ে ভাল কিছু হতে পারে না। আমি অলিম্পিয়া পাহাড়ই সবচেয়ে বেশি ভালবাসি।
চুপচাপ বসে সবার কথা শুনছিলো সক্রেটিস। চেরোফোন তাকে জিজ্ঞেস করলো, কই, তুমি তো কিছু বলছো না? পৃথিবীতে তোমার প্রিয় স্থানের নাম কি?
অতি মৃদু স্বরে সক্রেটিস উত্তর করলো, এথেন্স।
সবগুলো যুবক একসাথে চমকে উঠলো। আরে আমাদের মাতৃভূমি এথেন্সের কথাই তো আমরা ভুলে গেছি। দূরের সিন্ধুর কথা মনে করতে গিয়ে আমাদের এই সুন্দর জন্মভূমির কথা মনেই নেই। বলার উত্তেজনায় আমরা ভেবেছি, এথেন্স তো এথেন্স। তাকে বাদ দিয়ে অন্য কোন জায়গার কথা বলতে হবে। কিন্তু সক্রেটিস ঠিকই মনে রেখেছে। না, সক্রেটিস আসলেই সবার থেকে আলাদা। শত উত্তেজনায়ও স্থির থাকে। কি করা উচিত, কি বলা উচিত, সেই বিষয়ে সবসময়ই সে একেবারে নিখুঁত।

সক্রেটিস মৃদু স্বরে বলে যাচ্ছে, হুম, এথেন্সই আমার সবচেয়ে প্রিয় স্থান। এই নগরীটিকে আমি ভালোবাসি। একেবারে প্রেমিকার মতো ভালোবাসি। এই নগর থেকে ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে আমি থাকতে পারি না।

যে শহর ছেড়ে সক্রেটিস অন্য কোথাও থাকতে পারে না, সেটি তার জন্মভূমি এথেন্স। ভূমধ্য সাগর আর এজিয়ান সাগরের পা ছুঁয়ে ছোট্ট একটা পাহাড়ী ভূমি। কয়েকটা ছোট বড় পাহাড়ের মধ্যে টুকরো টুকরো অল্প কিছু সমতল জমি। তার মাঝে একটা মাঝারী উচ্চতার পাহাড়কে ঘিরে এই এথেন্স শহর। মাঝের এই পাহাড়টাকে ওরা বলে এক্রোপোলিস। এক্রো মানে উঁচু আর পোলিস মানে নগরী। এই এক্রোপলিস বা উঁচু নগরীর গা ছুঁয়েই শহরের প্রাণকেন্দ্র। কেন্দ্রটিকে ওরা বলে আগোরা বা বাজার। নামেই এটি বাজার, আসলে নগরের সকল সরকারী অফিস, আদালত, জেলখানা সবকিছু এই আগোরার ভেতরেই। এর চারপাশেই শহরের বেশির ভাগ মানুষ বাস করে। এই এক্রোপলিস আর আগোরাকে ঘিরেই নগররাষ্ট্র এথেন্স।

আগোরার পূর্ব দিকের কোনায় একটি ছোট্ট মন্দির। মন্দিরটি গ্রিক দেবতা জিয়ুসের। সেই মন্দিরের পাশের এক টুকরো ঘাসের উপর বসে সক্রেটিস আর আর সঙ্গী যুবকেরা আলাপ করছিলো। এটাই সক্রেটিসের সান্ধ্য আড্ডাখানা।

আড্ডার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর হয় না। দুইদিক জলপাই গাছে ঘেরা রাস্তার পারে সারি সারি চমৎকার সব ভাস্কর্য। সামনের সরকারী অফিসগুলোর দেয়ালে হোমারের একিলিস, পুরাণের হারকিউলিস সব বীররা এক জায়গায় নিয়ে এসেছে। দেয়ালে ঝুলে ঝুলে তারা কেউ যুদ্ধ করছে, কেউ বিচার করছে, আবার সুযোগ পেলে কেউ প্রেমও করছে। নিবিড় একান্ত সে প্রেম।

একটু দূরে তাকালেই এক্রোপোলিস, বড় পবিত্র জায়গা। সেখানে শহরের অধিষ্ঠার্থী দেবী এথিনার মন্দির।

এথেন্সের কথা বলতে বলতে এথিনার মন্দিরের দিকে তাকালেন সক্রেটিস। এথিনার নামেই এথেন্স। গ্রিক ভাষায় শহরের নামও এথিনা।
সক্রেটিস বললো, এথেন্স হচ্ছে আলো। ওই সাগরের ওপারে তাকিয়ে দেখো, সারা পৃথিবী অন্ধকার। আর এথেন্সের দিকেও তাকাও। দেখো এথেন্সেই বাতি জ্বলছে। জ্ঞানের বাতি, বিদ্যার বাতি।
চেরোফন মনে হয় আজ একটু নেশা করেছে। সে সবার থেকে বেশী কথা বলছে। দেশ প্রেমের কথায় তার নেশা মনে হয় আরো বেড়ে গেছে। সে ঝুঁকে ঝুঁকে বললো, হুম, এথেন্সেই তো জ্ঞান থাকবে। কারণ আমরা যে জ্ঞানকে বন্দী করে ফেলেছি।
সবাই তার দিকে তাকাল।
চেরোফন উৎসাহের সাথে বলতে লাগলো, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা যাযাবরের মত ঘুরছিলো এক খণ্ড মাটির জন্য। কোথায় বসতি গড়া যায়? ঘুরতে ঘুরতে এজিয়ান সাগরের পাড়ে এই জায়গাটি তাদের পছন্দ হলো। তারা দেবতাদের রাজা জিউসকে ডাকলো, হে জিউস, আমাদের অনুমতি দাও, আমরা এখানে নগর বানিয়ে বাস করব। কিন্তু জিউস এলো না। সে পাঠিয়ে দিলো তার মেয়ে এথিনাকে। এথিনা হলো যুদ্ধের দেবী, সেই সাথে তিনি জ্ঞানেরও দেবী, বিদ্যারও দেবী। এথিনা উড়ে উড়ে এখানে এলো। সবাই মহাখুশী। তারা ধুমধামের সাথে দেবীকে নিয়ে এক্রোপোলিসের উপর গেলো। সেখানে এথিনাকে শ্রদ্ধা, ভক্তি করে দেবির নামেই শহরের নাম ঘোষণা করলো এথিনা। দেবী ভীষন খুশী হলেন। তিনি তার মাথার মুকুট থেকে একটা জলপাই ডাল দিয়ে বললেন, এই নাও, আজ থেকে তোমাদের আর কোন অভাব হবে না। এথেন্সের পাহাড়ি মাটিতে জন্ম নিলো হাজার হাজার জলপাই গাছ। সেই জলপাই তেল দেশে বিদেশে বিক্রি করেই এখন এথেন্সবাসী টাকা পয়সা বানাচ্ছে। এই তেল বিক্রি করেই এথেন্স অন্য দেশ থেকে খাদ্য শস্য কিনে।
এর পর দেবী এথিনা বের করলো তার পোষা পেঁচা। দেবী বললো, অন্ধকারে পথ চলতে লাগে জ্ঞানের আলো। জ্ঞানের আলোতে অন্ধকারেও দেখতে পাবে, পথ হারাবে না। আমার এই পেঁচা অন্ধকারে দেখতে পায়। তাই ও হলো জ্ঞানের প্রতীক। এই নাও। আজ থেকে এই জ্ঞান এথেন্সের। এখন থেকে এথেন্স হবে জ্ঞানের জায়গা, জ্ঞানীদের বিচরণভূমি। এই মুহূর্ত থেকেই এথেন্সবাসী হবে অনেক অনেক বুদ্ধিমান।
দেবীর কথা মত এথেন্সবাসী অনেক বুদ্ধিমান হয়ে গেলো। আর বুদ্ধি পেয়ে এথেন্সবাসী প্রথমেই সেটা প্রয়োগ করলো দেবীর উপরেই। তারা বুদ্ধি করলো কিভাবে দেবীকে আটকে রাখা যায় এথেন্সে। তারা দেবীর পাখা কেটে দিলো। দেবী আর সেখান থেকে উড়ে যেতে পারলেন না। তিনি আটকা পড়লেন এক্রোপোলিসের উপর। তার সাথে আটকা পড়লো জ্ঞান, বিদ্যা। সেই থেকে এথেন্সে জ্ঞানের বসতি, বিদ্যার ওড়াওড়ি। এজন্যেই এথেন্স জ্ঞানের নগর, আলোর শহর।

চেরোফোন কথা শেষ করতেই সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। সক্রেটিস বললো, হাসি পেলেও ব্যাখ্যাটা কিন্তু মন্দ দেয়নি নি চেরোফোন। ও যা ভেবেছে, বলে দিয়েছে। তুমি দেবীর পাখা কাটো আর নাই কাটো, জ্ঞান যে এথেন্সে বাধা পড়েছে – সেটাতে তো কোন ভুল নেই। এবার তোমাদের কথা বলো। তোমরা কেন এথেন্সকে পৃথিবীরর সেরা স্থান মনে করো।
একজন বললো, এথেন্স গণতন্ত্র আবিষ্কার করেছে। এই মাটিতেই রাজা-রাণিদের বাদ দিয়ে মানুষের শাসন আমরা চালু করেছি। আমরাই প্রথম বলেছি,কোন রাজার দরকার নেই, রাণীর প্রয়োজন নেই। আমরা নিজেরাই নিজেদের শাসন করতে পারি।এই নিজেদের শাসনের নামই গণতন্ত্র। পৃথিবীতে এই ব্যবস্থা আর কোথাও নেই। আমরাই পৃথিবীকে গণতন্ত্রের আলো দিয়েছি।
আরেকজন বললো, আমরা থিয়েটার আবিষ্কার করেছি। অভিনয়ের নতুন দিক নিয়ে এসেছি। আমাদের ট্রাজেডির মত জিনিস সারা পৃথিবীর কোথাও নেই। তাকিয়ে দেখ, ওই এক্রোপোলিসের উপর ডিয়োনিসিসের থিয়েটার। ওখানে আমরা যে অভিনয় করি, এমন সৃষ্টিশীল বিনোদন আর একটিও কি পৃথিবীর কোথাও আছে?
আরেকজন বললো, কেন, যুদ্ধে আমরা কম কিসে? পৃথিবীর সুপার পাওয়ার পারস্যকে আমরা হারিয়েছি। এইখানে এই মাটিতে পারস্যের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী পরাজয় স্বীকার করে এথেন্স থেকে পালিয়ে গেছে।
চেরোফন দেখলো, জ্ঞানের কথা আর কেউ কিছু বলছে না। সে জ্ঞানপ্রেমী মানুষ। সে আবার বললো, জ্ঞানের জন্যই কিন্তু এথেন্স পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা জায়গা। সারা পৃথিবীর জ্ঞানপ্রেমী সফিস্টরা ঘুরে ফিরে কোথায় এসে আশ্রয় নেয়? এই এথেন্সে। আমাদের আগোরার আশে পাশে যত জন সফিস্ট ঘুরে বেড়ায়, বাকি তামাম দুনিয়া ঘুরে তার অর্ধেক জ্ঞানী মানুষও পাবে না। জ্ঞানের জগতে এথেন্সই সেরা।
আরেকজন বললো, এথেন্স পৃথিবীকে শিখিয়েছে আইনের শাসন। বিচার কাজ। এখানে শুধু এক জনের ইচ্ছাতেই শাসন হয় না। আইনের মাধ্যমে সকল নাগরিক মিলে শাসন করে। এটা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এমন করে আদালতের মাধ্যমে বিচার আর কোথাও নেই। এখানে মানুষ যে কোন কিছু বলতে পারে। কথা বলার অধিকার আছে। এই অধিকারের জন্যই আমাদের ট্রাজেডি, আমাদের কমেডি সহ সকল শিল্পকলা এমনভাবে এগিয়ে চলেছে।

সক্রেটিস এবার গম্ভীরভাবে বললো, তোমরা যে গণতন্ত্রের কথা বললে, সেটা ভাল না মন্দ তা সময়ই বলবে। তবে একথা একেবারেই ঠিক যে, এথেন্সের ইতিহাসে এই সময়টাই সেরা সময়। এমন স্বর্ণযুগ এথেন্সে আগে কোনদিন আসে নি। আজ আমরা এথেন্সের সবকিছু নিয়ে গর্ব করি। হুম, এথেন্স সবকিছুতেই পৃথিবী সেরা। কিন্তু আমাদের আরো জ্ঞানের দরকার আছে।
চেরোফোন বললো, হুম, জ্ঞানের কোন শেষ নেই, যত হয় ততই ভাল।
আর একজন বললো, আরো জ্ঞান? এতো জ্ঞান আমরা কোথায় রাখব? কিছু জ্ঞান জাহাজে করে বেচে দেয়া যায়!
– হ্যাঁ, হ্যাঁ, এক জাহাজ জ্ঞানের দাম কত হবে? এক ট্যালেন্ট নাকি আরো বেশি?
চেরোফনো হাসতে হাসতে যোগ করলো, আরে জ্ঞান কি এতো সস্তা নাকি? এক ট্যালেন্ট স্বর্ণ দিয়ে একটি যুদ্ধ জাহাজ বানানো যায়। তাইলে এক জাহাজ জ্ঞান দিয়ে তো শত শত যুদ্ধজাহাজ বানানো যাবে।

সক্রেটিস কিন্তু গম্ভীর। সে বললো, তোমরা যে জ্ঞানের কথা বলছো, সেটি হলো বাইরের জ্ঞান। আর আমি বলছি ভেতরের জ্ঞানের কথা।
– ভেতরের জ্ঞান? সে আবার কি বস্তু?
– হুম, চেরোফোন, তুমি তো ডেলফিতে এপোলোর মন্দিরে অনেক গিয়েছো। বলো, ওই মন্দিরের গায়ে কি লিখা আছে?
চেরোফন বললো, লিখা আছে – নিজেকে জানো।
– ঠিক তাই, নিজেকে জানো। এটাই ভেতরের জ্ঞান। আত্মজ্ঞান।
সবাই একদৃষ্টে সক্রেটিসের দিকে তাকালো। এই কদাকার লোকটা হঠাৎ হঠাৎ এমন কিছু কথা বলে যে, মনে হয় এমন কথা আর কেউ বলেনি। মনে হয় এর চেয়ে সত্য কথা আর নেই। কিছুক্ষণ লোকটার সাথে থাকলে মনে হয় ওর চেয়ে কত কম জানি। অথচ জ্ঞানের কোন অহংকার নেই। হাসিমুখে বন্ধুর মত বলে যাচ্ছে এক একটা নতুন কথা। অল্প সময়েই কেমন করে যেন একটা অজানা সম্মোহন তৈরি হয় লোকটার প্রতি।
নিজের অজান্তেই সবার মনে ফিস ফিস শব্দ উঠলো – নিজেকে জানো। নিজেকে জানো।

 

লেখক// সুজন দেবনাথ (অব্যয় অনিন্দ্য),  ফার্স্ট সেক্রেটারি, বাংলাদেশ দূতাবাস, এথেন্স