অনামিকা কণার গল্প ‘আলোর নূপুর’

অ না মি কা  ক ণা
আলোর নূপুর

বাবা-মার আদরের এবং একমাত্র মেয়ে আলো। কিছুতেই অভাব নেই আলোর। ভালোবাসা ও অর্থকড়ি কিছুতেই না। পরিবারের সবার মধ্যমনি সে। দাদা-দাদি, চাচা-চাচি এমনকি তার সৎ মায়েরও। অবশ্য সৎ মা বলতে যা বোঝায় ঠিক তেমন নন তিনি। এই মেয়েটির জন্য সন্তানও নেননি। রাজি করাতে পারেনি তারা বাবাও।

মা মরা মেয়ে আলোকে কখনো স্নেহের অভাব দেননি। আলোকে বুঝতে দেননি-তার জন্মদাত্রী বেঁচে নেই। আলো ছোট মা বলে ডাকে।

আলো আর অভি একই পাড়ার সমবয়সী। ক্লাসমেটও। দু’জনেই এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সবে কলেজে ভর্তি হয়েছে। ভর্তির সময় আলোর সব কাজ অভি করে দিয়েছিলো। যদিও সক্ষতা গড়ে ওঠেনি কারো। আলো নিজে থেকে কোন কথা বললে অভি শুধু উত্তর দিতো। আগবাড়িয়ে কখনো কিছুই বলেনি। অবশ্য মনে মনে খুব চাইতো। প্রকাশ করেনি।

একই পথে আসা যাওয়ার দরুন দেখা সাক্ষাৎ হয়। আলো আর অভির দূরত্ব কমতে থাকে। ধীরে ধীরে অভি মনের ভেতর আবিস্কার করে আলোর অস্তিত্ব। কিন্তু বলতে পারে না। প্রতিদিন ভাবে, প্রস্ততি নেয়। কিন্তু আটকে যায়। শেষ পর্যন্ত না জানি বন্ধুত্বটাও নষ্ট হয়ে যায়- এই ভেবেআটকে যায়। আলোকে তার মনের কথা জানায় না।

সেদিন পহেলা বৈশাখ। নানান আয়োজনে আর অনুষ্ঠানে দিনটি থাকবে উচ্ছ্বল। বৈশাখী সাজে সবাই ক্যাম্পোসে আসতে শুরু করে। লাল সাদার পাঞ্জাবীতে অভিও এসেছে। আলো লাল টুকটুকে শাড়ি পড়েছে। হাতের মেহেদি। পায়ে আলতাও। বন্ধুদের চোখ এড়ায় না। অভি পক্ষে হয়ে না হয় তারাই আলোকে জানাবে সব। হঠাৎ মেয়েদের সারি থেকে উঠে আসে আলো। অভির হাত ধরে এক প্রকার টেনে বাইরে নিয়ে যায়। তারপর যা ঘটে, অভির কল্পনাতেও ছিল না, আসেনি কখনো।

লাজলজ্জার মাথা খুইয়ে আলো বলে- তোমাকে ভালোবাসি। অভি, জানি না তুমি কী ভাবছো। তবে সত্যিটা জানালাম। তুমি কি আমাকে ভালোবাসবে?

একটা ছোট্ট মেয়ে যেভাবে আবদান করে এটা ওটা চায়, তেমন সরল মুখ দেখতে পেলো অভি। খুশিতে, আনন্দে আত্মহারা। কিন্তু মুখে কথা বের হলো না। বোবার মতো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে এ সময় কী বলতে হয়, কিছুই সে জানে না। শুধু জানে, বহু চেষ্টা করেও এ কথাটিই বলতে পারেনি। একটা নূপুর বহু আগেই সে বানিয়ে রেখেছিলো। দিতে পারেনি।

অভি কথা না বলে সেটাই আলোকে দিতে মনোস্থির করলো। পকেটে হাত দিলো। ভ্যালভেট থলে মোড়া উপহারটি বের করলো। বাড়িয়ে দেবে এমন সময় কে যেনো আলোকে যাক দিলো। হচকচিয়ে আলো পেছনে তাকালো। তারপর আসছি বলে চলে গেলো।

অপেক্ষায় অপেক্ষা বহু সময় পেরিয়ে গেলো। আলো এলো না। অনুষ্ঠানের কাছে ঘুরে খুঁজেও পেলো না। আলোর বান্ধবিদেরকে জিজ্ঞেস করেও না। অবশেষে বন্ধুদের জানালো।

তখন সন্ধ্যে হয় হয়। আলোর বাড়ির সামনে অভি আর তার বন্ধুরা। বাড়িতে মরিচবাতি জ্বলছে। ভেতরে কারো বিয়ের প্রস্তুতি চলছে। সানাই বাজছে। আর অভির হাতে নিশ্চুপ পড়ে আছে আলোর নূপুর।