আনোয়ার হোসেন বাদলের গল্প ‘অমানুষ’ : শেষ পর্ব

খোকা ভীষণ ভয় পেয়ে বাবার গলা সজোরে আঁকড়ে ধরে আছে। খোকাকে নিয়ে সাঁতার দিতে গিয়ে রথু তল খুঁজে পাচ্ছে না। তার কন্ঠনালী পেঁচিয়ে ধরেছে পাঁচ বছরের খোকা। আপ্রাণ চেষ্টা করেও তাকে ছাড়াতে পারছে না রথু বল্লভ। রথু স্পস্ট বুঝতে পারছে, মরণ কাছাকাছি। তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ছেলে প্রাণের ভয়ে বাবার গলা ফাঁসের মতো আটকে ফেলেছে। উপায় না পেয়ে খোকার কচি হাতের কব্জিতে তীব্র কামড় বসিয়ে দেয় রথু বল্লভ, ভেসে যায় পাঁচ বছরের সূর্য্য।

রথু একটা কড়াই গাছ পেয়ে যায়, সেটাকে আঁকড়ে ধরে সময় কাটাতে থাকে। রাত তিনটার দিকে ঝড় থেমে যায়, পানি সরে যেতে যেতে সকাল হয়ে যায়। রথুর শরীরে তখন বিন্দু মাত্র শক্তি নেই। মনের অবস্থও ভীষণ খারাপ, অনেক মানুষ ভেসে যেতে দেখেছে। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে সে। তার প্রাণের ধন, বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন তার খোকাকে সে নিজেই ঠেলে দিয়েছে মৃত্যুর মুখে।

গাছ থেকে নেমে এসেছে রথু বল্লভ। রাতের অন্ধকারে খেয়াল করেনি শরীরের কতো স্থানে কেটে ছিড়ে গেছে। রাতের স্মৃতি মুহূর্তে তাড়া করতে থাকে। উদভ্রান্তের মতো রথু ডেকে ওঠে- খোকা…., মালতি….!খুঁজতে থাকে পাগলের মতো। কোথাও দেখা পায় না তার খোকার, তার মালতির।

রথু ভালো করেই জানে, খোকা আর বেঁচে নেই। তারপরও খুঁজতে খুঁজতে অনেকটা ভাটির দিকে চলে আসে। কিন্তু কোথাও কেউ নেই।  একটি লাশ পড়ে আছে গনি মোল্লার কাছারীর পশ্চিম পাশে বেত ঝাড়ের পাশে। বুকটা হুহু করে ওঠে তার, খোকার বাঁচতে চাওয়ার আকুতি আর সেই অবস্থায় তার কচি হাতের কব্জিতে কামড় দিয়ে ছুটিয়ে দেয়ার নিষ্ঠুর স্মৃতি তার কলিজার মধ্যে লেজার মতো বিঁধতে থাকে। তার বুকে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে দুঃসহ আগুন। ভিষণ নাড়া দেয়, মনে পড়ে মালতি বড় মিয়ার বাড়ি যেতে চেয়েছিলো। নিষেধ করেছে সে।

মুছুল্লী বাড়ির বাগের মধ্যে কতগুলো কুকুরের দাপাদাপি নজরে আসে রথুর। কাছে যায়। তাকাতে পারে না। আকাশ কাঁপিয়ে আর্তনাদ করে ওঠে রথু বল্লভ। তার খোকার দখল নিয়ে কুকুরেরা ভাগাভাগি করছে। এখনও কেউ শরীরে কামড় বসাতে পারেনি। তবে রাতে রথু যে কচি হাতটির উপর কামড় বসিয়েছিলো সেখানে বানের জলে দগদগে ঘায়ের মতো হয়ে আছে।

রথুর বন্য কুকুরগুলোর মাঝে নিজের ছবি খুঁজে পায়। সে হঠাৎ কুকুড় গুলোর উপর ঝাপিয়ে পড়ে কুকুরের মতো দুর্বোধ্য ভাষায় বলে ওঠে, ওড়ে তোরা এদিকে আয় আমার সাথে কামড়াকামড়ি কর। এই ভাগ আমার। আমিই যে প্রথম কামড়েছি খোকাকে।

কুকুরগুলো থেমে যায়। কী ভেবে চলেও যায়। খোকার লাশ কোলে নিয়ে বাঁধের উপর উঠে আসে রথু। বাঁধের উপর অনেক মানুষ। খবর পেয়ে বাপজানও ছুটে আসেন। তাকে দেখা মাত্র রথু চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে-

 

‘ও বড়মিয়া তোমার বন্দুকটি দিয়ে আমার বুকটা ঝাঝরা করে দাও। আমি যে পশু হয়ে গেছি। আমার খোকাকে মেরে ফেলেছি। মালতিকে মেরে ফেলেছি।’

ভাষা হারিয়ে ফেলেন বাপজান। তাঁর দু’চোখের পানিতে দাড়ি ভেসে যায়। রথুকে দু’হাতে ধরে কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন,

‘শান্ত হ রথু, সবই কপাল। তোকে কাল সন্ধ্যায়ও ওদেরকে নিয়ে আমার বাড়ি চলে আসতে বলেছিলাম। শুনলি না।

বাপজানের পাশেই রফিক দাঁড়ানো ছিলো। রথু হঠাৎ তাকে আঁকড়ে ধরে ঢুকরে কেঁদে ওঠে। রফিকও কাঁদে। সাত বছরের রফিকের কাছে রখুর ছেলে সূর্য্য হিন্দু নয়, মুসলমান নয়। সূর্য্য তার সহোদর ভাই। রথুকে প্রশ্ন করে

-সূর্য্যকে কামড়ালে কেন কাকা? ছোট্ট মানুষকে কেউ কামরায়?

-আমি যে মানুষ নই বাবা, আমি যে পশু হয়ে গেছি।

বাপজানের দিকে ফিরে আবারও বলে ওঠে,

– আর বেঁচে কি করবো? মেরে ফেলো বড় মিয়া। আমি যে তোমার সূর্য্যকে মেরে ফেলেছি।

চারিদিকে দাড়ানো সব মানুষগুলো যেন বোবা হয়ে যায়।

রথুর মনে হতে থাকে তার খোকা যেন রাজগঞ্জের সকল মানুষের সন্তান। সবাই যেন সূর্য্যর বাবা মা। সূর্য্যর তিনদিন বয়সের সময় বাপজান তার হাতে দশটি টাকা দিয়ে বলেছিলেন সূর্য্য সবার অন্তরে স্থান পাবে। বড়মিয়ার সে দোয়া ঈশ্বর কবুল করেছেন।

 

রফিক নীরব দৃষ্টিতে সূর্য্যের দিকে তাকায়। তারপর সবার দিকে বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

আনোয়ার হোসেন বাদলের গল্প ‘অমানুষ’ : পর্ব- ১

SHARE