আনোয়ার হোসেন বাদলের গল্প ‘অমানুষ’ : পর্ব- ১

গেল বছরের ঝড় আর জলোচ্ছাসের ভয়ঙ্কর স্মৃতিগুলো কারও মন থেকে তখনও ফিকে হয়ে যায়নি। রথু বল্লভের পাঁচ বছরের খোকা যে কীভাবে মারা গিয়েছিলো, সে কথা মনে হলে রাজগঞ্জের কেউ এখনও চোখের পানি রাখতে পারে না।

রথু বল্লভ বাপজানের পুরণো কর্মচারী, রথুর বাবা কার্তিক বল্লভও দাদাজানের কর্মচারী ছিলেন। কর্মচারী হলেও রথু বল্লভ বাপজানের বন্ধুর মতো। সমগ্র জীবন বাপজানের সাথে ছায়ার মতো থেকেছে। বয়সে বাপজানের থেকে বছর দশেক ছোট। বাপজান এখন আর্থিকভাবে পতিত, জমিজমা সবই নদীতে বিলীন হয়ে গেছে, তবু রথু বল্লভ তাঁকে সব সময়ই মনিব জানে যদিও বাপজান রথুকে ভাইই মনে করে।

মালতীর সাথে বাপজানই  রথুর বিয়ের ব্যবস্খা করেছিলেন। সংসারী হয়ে বাপজানের সহযোগিতায় নাও জাল যোগার করে নদীতে মাছ ধরার কাজ শুরু করে রথু । রাজগঞ্জ খালের দক্ষিণপাড় নদীর তীর ঘেষে বাপজানের ভিটায় ঘর তোলে রথু আর মালতি, দেখতে দেখতে ঘর আলো করে মালতির কোলে খোকার জন্ম হয়। রথুর সে কী আনন্দ। খোকাকে নিয়ে রথুর মা,  স্ত্রী মালতি রফিকদের বাড়ি এলে বাপজান খুশি হন। রথু বলে ‘প্রনাম কর মালতি, প্রনাম কর। বড় মিয়ার দয়ায়ই তো সব হলো।’

মালতি গড় হয়ে প্রনাম করে নীচুস্বরে বলে- খোকার নাম দেন বড়মিয়া। বড়মিয়া কী এক সম্মহনি শক্তি নিয়ে বলেন, ‘আমি কি নাম রাখবো? তোমাদের সাস্ত্রমতে কিছু একটা রেখে দাও।’

‘তা হবে কেন বড়মিয়া?’ রথুর মা এগিয়ে আসেন, ‘আমাদের জন্যে আপনিই সব,  নাতির নাম রেখে আল্লাহর নামে দোয়া করে দেন । আপনি ধার্মিক মানুষ, ভগবান আপনার কথা মানবেন।’

খুশী হন বাপজান, এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে সম্প্রীতির বন্ধন পুরুষানুক্রমিক। বিশেষ করে রাজগঞ্জের হিন্দু, মুসলমানদের মাঝে সামাজিক দুরত্বটা খুবই কম। তার উপরে রথু বল্লভের পূর্ব পুরুষ থেকে বাপজানের পরিবারের সম্পর্ক খুবই আত্মিক। এরা পরস্পর পরস্পরের সামাজিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে নির্দ্বিধায় অংশ নেন।

বাপজান খোকার নাম রাখেন সূর্য। দশটি টাকা খোকার হাতে দিয়ে বলেন, ‘আল্লাহ ওকে বড় করবেন, ও সবার অন্তরে স্থান করে নেবে।’

অগ্রহায়ন মাস, সবে রাজা শাইল, কার্তিক জাল আর কুটি আগনি ধান কেটে ঘরে ঘরে নবান্ন উৎসবের আয়োজন চলছে। খেজুর গাছ ছেলা হলেও হাড়ি পাতা হয়নি। মাঠের দিকে তাকালে প্রাণ ভরে যায়, এতো ফলন গত দশ বছরে হয়নি তবে নদীর ভাঙনটা যেন বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। তিনদিন আগে দুপুর বেলা মেরেজ আলী মুছুল্লীর কবর আর কবর সংলগ্ন মসজিদটি সবার চোখের সামনে তলিয়ে গেল। মসজিদ ঘেষা পঞ্চাশ হাত নারিকেল গাছটির পাতা এখনও ভাটার সময় পানির উপরে উঁকি দেয়।

রবিবার সকাল থেকেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। রথু বল্লভের নতুন ঘরটি নদীর একেবারে কিনারে। আকাশের ভয়াবহ অবস্থা আর গাঙের পানির ভয়ঙ্কর রুপ দেখে আগের দিনই অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছিলো। রথুর সাথে বাপজানের সম্পর্কটা পারিবারিক। আগেরদিন বাপজান রথুকে বলেছিলেন,

আকাশের অবস্থা ভালো মনে হচ্ছে না রথু, সবাইকে নিয়ে আমাদের বাড়ি চলে আয়।

রথুর মা আর বিধবা বোন পারুল এসেছিলো। স্ত্রী মালতি অবশ্য আসতে চেয়েছিলো। রথু অভয় দিয়ে বলেছে,

ভেবো না সূর্যর মা, নতুন ঘর তুলেছি ঈশ্বরের কৃপায় কিচ্ছু হবে না।

খোকাকে রেখে আসবো?

দরকার নেই, পানি বেশি দেখলে নৌকো নিয়ে চলে যাবো।

রাত দশটার পর যখন বৃষ্টির তীব্রতা বেড়ে তার সাথে ধমকা হাওয়া শুরু হয়। রথু তখন জালের কাছি দিয়ে ঘরের আড়া নারিকেল গাছের সাথে শক্ত করে বাঁধে।

 

হঠাৎ জলের গতি বেড়ে গেলে রথুর বউ মালতি চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে

ও সূর্য্যর বাপ, আর বুঝি কিছু থাকবে না! পাহাড় সমান উচু হয়ে জল আসতেছে!

ভয় করিস না মালতি আমি আসছি।

 

রথু কথা শেষ করতে পারে না। মালতি ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে যায়। খোকা ঘরের একটি খুঁটি আকঁড়ে ধরে ছিলো। রথু এসে খোকাকে কাঁধে নিয়ে সাঁতার দেয়। নদী থেকে আনুমানিক পঞ্চাশ গজ পূবে বেড়িবাঁধের ভিতরে রথুর ঘর। তার ঘরের সোজাসুজি বেড়িবাধ ভেঙে গেছে। পশ্চিম দিক থেকে পাহাড় সমান উঁচু হয়ে ঢেউ আসছে।

 

আনোয়ার হোসেন বাদলের গল্প ‘অমানুষ’ : শেষ পর্ব