আফরোজা রিতুর গল্প ‘আমি ফিরে এসেছি’

আ ফ রো জা  রি তু
আমি ফিরে এসেছি

 

অনেক রাত। কুয়াশারা ভিড় জমিয়েছে। কিন্তু চাঁদ নাছোরবান্দা। কুয়াশার জাল ভেদ করে রূপালি আলোয় উদ্ভাসিত পরিবেশে ধূপছায়া খেলছে যেনো। সাথে মিষ্টি একটা সুখ খেলে যাচ্ছে বর্ষার মনে।

আবছা আলোয় আকাশের দিকে তাকিয়ে বর্ষা সোনলি স্মৃতি, স্মৃতিতে সুখকর অতীত খুঁজতে থাকে। হারিয়ে যায় সে। মনে মনে ভাবে- প্রতিটি মূহুর্ত মনে রাখার জন্যই যেনো প্রতিটি দিন হয়ে যায় অতীত।

খুব দূরে নয়, রিভিউ করা স্মৃতির আলমারিতে পড়ে থাকা দিনগুলোকে খুব মনে পড়ে তার। কতো স্বপ্ন, কতো আদর-শাষণে কাটতো সময়গুলো। নিজেকে তখন দায়িত্বশীল আর ধৈর্যের বিশাল মানবমূর্তি হিসেবে আবিস্কার করতো। নীতিকথার জমাট শব্দগুলো। শব্দগড়া লাইনসমূহ। ভাবতেই অবাক হয় সে।

এতো সুন্দর আর গোছালো উপদেশ! নিজের কাছে বিষ্ময়বোধ হয় এখন। কখনো হাসি পায়, আবার সেদিনের তাকে ভেবে চোখের কোণ বেয়ে এক, দু’ফোঁটা পানি জমিন স্পর্শ করে।

কী করছে এখন। তারো কি মনে পড়ে। কাঁদায় কি স্মৃতিরা? বর্ষা ভাবে আর ভাবে। হয়তো। হয়তো না। হয়তো সেও তার মতোই স্মৃতির রোমান্থন করে  কাজের ব্যস্ততায়, নাগরিক জীবনে। হয়তো নতুনের ছোঁয়ায় ভুলেছে সব।  পাওয়ার আনন্দে।

তবে প্রথম দিনটি নিশ্চয় ভুলতে পারবে না অরণ্য। এমনই এক বিশ্বাস আরো বেশি করে চেপে ধরে বর্ষাকে নিয়ে যায় সে রাতে।

সে রাতেও কুয়াশা ছিলো। কুয়াশা চাদরে মুড়ে সময়গুলো বাসর সাজিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলো। পাশে ছিলো অরণ্য। আজ ঘন কুয়াশা ছাড়া কেউ পাশে নেই।

রাতে ভেদে করে, কুয়াশা ভেদ করে সে রাতে ট্রেন অবিরাম চলছিলো। পাশাপাশি সিটে টিকিট কিনেছিলো বর্ষা, অরণ্যের মুখোমুখি চাই। জোর করেই মুখোমুখি টিকিট কেটে এনেছিলো অরণ্য। বর্ষার ঠিক মনে পড়ে- সে রাতে খুব অভিমান হয়েছিলো তার। অরণ্যের বুকে মাথা রেখে পথ চলতে চেয়েছিলো সে। কিন্তু সারা রাস্তা বর্ষার দু’চোখ না দেখে পথ চলতে একেবারেই নারাজ অরণ্য। বর্ষা অভিমান, রাগ ভুলে গিয়েছিলো।

হঠাৎ হঠাৎ চার চোখ যেনো কঠিনভাবে আটকে যাচ্ছিলো। লজ্জায় চোখ সরিয়ে নিচ্ছিলো বর্ষা। আবার অজানা কোনো এক টানে বারে বারে অরণ্যের চোখেই ফিরে যাচ্ছিলো। সেই চোখ আজ রাতে খুব মনে পড়ছে বর্ষার।মনে পড়ছিলো, এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা অরণ্যকে।

মুখে কথা না বললেও চোখের ভাষায় অনেক কথা বলছিলো তারা। দু’জন দু’জনেরটা বুঝেও নিচ্ছিলো। তবে সবটুকু বোঝার আগেই ট্রেন পৌঁছে যায় গন্তব্যে।

অবশেষে ট্রেন থেকে নামার পালা।। নেমে গেলো অরণ্য। বর্ষাকে কিছুই বললো না। আলাদা দুই পথে হেঁটেছিলো তারা। তবে কথা হলো না।

চোখের আড়ালে হতেই বর্ষা কিসের যেনো এক টান অনুভব করলো। অরণ্যের হেঁটে যাওয়া পথে দৌঁড়ে গেলো। কিন্তু খুঁজে পেলো না। হঠাৎ পিছন থেকে কে যেনো বললো, আপনি কি আমাকে খুঁজছো?

বর্ষা অবাক হয়নি। তবে কথাটা বলতেও পারলো না। বললো, কই, না তো! অরণ্য মুচকি হাসি দিয়ে চলে গেলো। রেখে গেলে ছোট একটা চিরকুট। যেখানে লেখা ছিলো- যদি মনে পড়ে তবে ফোন দিও।

এক, দুই করে পাঁচ দিন চলে গেলো। বহুবার চেষ্টা করেও কেনো জানি ফোন দিতে পারলো না বর্ষা। অজানা ভয় তাকে কল দিতে দেয়নি। সাতপাঁচ ছেড়ে লাজলজ্জার মাথা খেয়ে ফোন দেয় বর্ষা। অরণ্যের কথা শুনে বোঝে- সেও তার অপেক্ষায় ছিলো। অনেক কথা হয়। দিন গড়াতে থাকে। দুষ্টমিও হয় ফোনে ফোনে। কিন্তু মনের কথা খুলে বলে কেউই।

এক বিকেলে ধরলার পাড়ে দেখা করতে আমন্ত্রণ জানালো রফিক। বললো, তোমার  অপেক্ষায় থাকবো।’ উত্তরের অপেক্ষা করলো না।

সেই বিকেলে নীল শাড়ি পড়েছিলো বর্ষা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে টুইটুম্বুর যেনো ধরলা।  মাথার উপর পল্লবাচ্ছন্ন গাছ। গাছে বসা কয়েকটি পাখি। বর্ষা গাছের নিচে পা ছড়িয়ে বসলো। অরণের কথা ভাবতে ভাবতে অজানায় হারিয়ে গেলো। এর মধ্যে অরণ্য কখন যে এসেছে, বর্ষা খেয়াল করেনি। কাঁধে স্পর্শ টের পেয়ে সম্বিত ফিরে পেলো সে। অরণ্যের হাতে লাল গোলাপের গুচ্ছ।  ফিরে তাকাতেই বাড়িয়ে দেয় অরণ্য ।  বর্ষাও  হাত বাড়ায়। তারপর এই হাত দু’টো কতোটা প্রসারিত হয়েছে তার দিকে তা একবারো খেয়াল করিনি। এরপর দুষ্টু-মিষ্টি ভালোবাসায় দু’জনে বহুদিন হাতে হাত রেখে, চোখে চোখ রেখে নিজেদের ভালোবাসার লেনদেন করেছে। সেই স্মৃতিময় সময়গুলো পেরিয়ে হঠাৎ এক ঝড় তাদেরকে আলাদা করে দিলো। ট্রেনের যাত্রা শেষে হারিয়ে যাওয়ার মতো। শুধু সেদিন সাথে পেয়েছিলো একটি চিঠি, এদিনে কিছুই ছিলো না।

কিন্তু কেনো, তার উত্তর পাইনি বর্ষা। কেউ খোঁজও দিতে পারেনি। কোথায় অরণ্য বলতে পারেনি তার বাবা মাও।

তবে কোথায় সে।

এখন চুলে পাক ধরেছে। কপালে ভাজ পড়েছে। কিন্তু বর্ষা অরণ্যের অপেক্ষাতে আজো।

কুয়াশার রাতে চাঁদের ধুয়াশা থাকলেই সে স্মৃতিতে হারিয়ে যায়। উল্টাতে থাকে পাতার পর পাতা। ঠিক আজ রাতের মতো। হয়তো এমনই এক রাতে ফিরে এসে বলবে- আমি ফিরে এসেছি…