আ নি ফ রু বে দ এ র দ শ টি ক বি তা

[আনিফ রুবেদ ১৯৮০ সালের ২৫ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার চামাগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পৃথিবীর মৃত্যুদণ্ডপত্র (অনন্যা, ২০১১) এবং এসো মহাকালের মাদুরে শুয়ে পড়ি (ঐতিহ্য, ২০১৫) তার লেখা কাব্যগ্রন্থ।]
পৃথিবী আর আমার সন্তানেরা

আমার সন্তানেরা বড় হচ্ছে হুটোপুটি লুটোপুটি করে। এমন চঞ্চল আর এমন ঝগড়াটে আমি আর দেখিনি কোথাও। একদিন একটা ভূগোলক কিনে আনলাম বাসায়। আমার হাতে ভূগোলক দেখে তারা জিজ্ঞাসা করে – ‘বাবাগো, ও বাবা, এটা কী গো বাবা?’ বললাম – ‘এটা পৃথিবী।’ ‘বাবা, আমি পৃথিবী নেব’ – বলল একজন। ‘বাবা, আমিই পৃথিবী নেব’ – বলল আর একজন। সে কি তাদের হুড়োহুড়ি, কাড়াকাড়ি। বললাম – ‘থাক বাবারা, রাখ। এটা আমার কাছেই থাক।’

পরদিন,
এক সন্তান এসে বেশ বড়মানুষি কণ্ঠে বলল – ‘বাবাগো, দেখবেতো এসো, তোমার এক সন্তান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুতছে পৃথিবীর মুখে।’ তাড়াতাড়ি নুনুটা প্যান্টে গুঁজতে গুঁজতে এসে, সেও হাঁপাতে হাঁপাতে বলল – ‘বাবা, ও-ও আগেই মুতেছে পৃথিবীর মুখে।’

 

স্কচটেপ মারা পৃথিবী

বাসায় ফিরে –
রুমে উঁকি দিয়ে দেখি, স্কচটেপ দিয়ে জোড়া দিচ্ছে বসে বসে ভীত ছোট্ট মেয়ে আমার। চুপি চুপি পায়ে তার কাছে গিয়ে দাঁড়াই। হঠাৎ পিছন ফিরে আমাকে দেখেই ভয় পেয়ে যায় আরো। ভয় পেয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে ওঠে তার মুখ। বলি – ‘কী হয়েছে মা?’ মেয়ে কেঁদে ওঠে আর বলে – ‘বাবা, টেবিলের ওপর থেকে পড়ে গিয়ে পৃথিবীটা ভেঙ্গে গেছে।’

স্কচটেপ দিয়ে জোড়া লাগানো পৃথিবী এখন টেবিলের উপর।

 

 

 

ঘোড়ার গাড়ি আর মানুষের গাড়ি

তুমি যে বল, ঘোড়ার গাড়ি, একথা কি ঠিক কথা?
তুমি যে বল, গরুর গাড়ি, একথা কি ঠিক কথা?
ইচ্ছে করলে ঘোড়াটা আর ইচ্ছে করলে গরুটা কি এই
গাড়ি বিক্রি করে দিয়ে চলে যেতে পারবে আর এক
কোথাও?

তুমি বললে, ঘোড়ায় টানে বলে ঘোড়ার গাড়ি।
তুমি বললে, গরুয় টানে বলে গরুর গাড়ি।

ফেরার সময় বললাম, চল আমরা মানুষের গাড়ি
চড়ে বাড়ি ফিরে যায়। তুমি জিজ্ঞাসা করলে, মানুষের গাড়ি
মানে?

উত্তর দেবার আগেই বিষণ্ণ তুমি বুঝতে পেরেছিলে
রিক্সার কথা। তুমি বিষণ্নভাবে হাসতে হাসতে বললে,
মানুষেরা বুদ্ধি জানে বটে। ঘোড়া দিয়ে টানিয়ে নেয়
আর বলে ঘোড়ার গাড়ি, গরু দিয়ে টানিয়ে নেয় আর
বলে গরুর গাড়ি কিন্তু মানুষ দিয়ে টানিয়ে নিয়ে
মানুষের গাড়ি না বলে, নিজেকে কেমন করে
বাঁচিয়ে নেয়।

 

 

 

পৃথিবীর উপহার

তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলে – তোমার প্রিয়ফুল কী?
আমি বলেছিলাম – গোলাপ।
তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলে – তোমার অপ্রিয় ফুল কী?
আমি বলেছিলাম – গাঁদা।
তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলে – তোমার প্রিয় রং কী?
আমি বলেছিলাম – লাল।
তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলে – তোমার অপ্রিয় রং কী?
আমি বলেছিলাম – হলুদ।

ও পৃথিবী, তুমি আমাকে একটি হলুদ গোলাপ এবং একটি লাল গাঁদা দিয়েছ।

 

 


কাঠওয়ালা ঈশ্বর

‘কাঠওয়ালা, ও কাঠওয়ালা, বাড়ি আছ?’
‘কে? কী চাও?’
‘কাঠ চাই। খাট তৈরি করব। যীশু আরাম নেবে। ঈশ্বরপুত্র আমাদের প্রাণের যীশু।’
[কাঠওয়ালা ২৫টি তামার মুদ্রা গুনে নিল]

.
‘কাঠওয়ালা, ও কাঠওয়ালা, বাড়ি আছ?’
‘কে? কী চাও?’
‘কাঠ চাই। ক্রুশ তৈরি করব। যীশুকে গাঁথব। শয়তানপুত্র আমাদের ঘৃণার্হ যীশু।’
[কাঠওয়ালা ২৫টি তামার মুদ্রা গুনে নিল]

 

 

 

 

ইচ্ছা

মজি কানা বলে – ‘আমি কিন্তু কানা নই। আমি চোখ বন্ধ করে আছি। চোখ বন্ধ করে থাকা আমার অভ্যেস হয়ে গেছে। এভাবেই আমি সব দেখতে পাই।’ আমরা সাদা আর কালো দেখিয়ে বলতাম – ‘বলত, কোনটা কি?’ সে হাসতে হাসতে বলত – ‘এগুলো আমি দেখি না।’

রতন বোবা আকারে ইঙ্গিতে বলে – ‘আমি কিন্তু বোবা নই। আমি মুখ বন্ধ করে থাকি। মুখ বন্ধ করে থাকা আমার অভ্যেস হয়ে গেছে।’ আমরা বলতাম – ‘বলত, ভালবাসি।’ আবার বলতাম – ‘বলত, ঘৃণা করি।’ সে হেসে ইঙ্গিতে বলত – ‘এগুলো আমি বলি না।’

গাফ্ফার বয়রা বলে – ‘আমি কিন্তু বধির নই। কান বন্ধ করে রেখেছি। কিছু না শোনা আমার অভ্যেস হয়ে গেছে।’ আমরা তাকে গালি দিতাম আর জিজ্ঞাসা করতাম- ‘বলত কি বললাম?’ আমরা তাকে প্রশংসা কথা বলতাম আর জিজ্ঞাসা করতাম – ‘বলত, কি বললাম?’ সে হেসে বলত – ‘এসব আমি শুনি না।’

একই সাথে অন্ধ হবার, বোবা হবার, বধির হবার বড় ইচ্ছে আমার।
জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে নবু গাড়িয়াল ও তার বউ

স্বপ্নে প্রায়ই দেখতাম – গরুর গাড়িতে করে একটা চাঁদ আর একটা সূর্য নিয়ে যাচ্ছে আমাদের নবু গাড়িয়াল। তার মাথায় বাঁধা থাকত জলের ফিতা।

যেদিন যেদিন এ স্বপ্ন দেখতাম, সেদিন সেদিন খুব ভোরেই ছুটতাম তার বাড়ি আর দেখতাম, নবু গাড়িয়াল তার পান্তা ভাতে লবণ কম হয়েছে বলে বউকে বকা দিচ্ছে। কখনো দেখতাম, তার বউ তাকে গালি দিচ্ছে সুন্দর একটা শাড়ি কিনে আনেনি বলে।

কিন্তু, আমাকে দেখে তারা দু’জনেই তাদের ভেতরের মালিন্য ঝেড়ে, বেশ খুশি হয়ে উঠত আর বলত – ‘বাবা তুমি এসেছ, বস।’ নবু গাড়িয়াল বলত – ‘তোমার চাচিও ভাল মানুষ, আমিও।’ তার বউ বলত – ‘তোমার চাচাও ভাল মানুষ, আমিও।’

আমি ফিরতি পথ ধরলে নবু গাড়িয়াল বলত – ‘মৃত্যু ভয়ঙ্কর কিছু নয় বাবা, মৃত্যুকে ভয়ঙ্কর করে তুলেছে ধর্মবেত্তারা। জীবনই ভয়ঙ্কর, অযথাই কাউকে ভাল বলতে হয়, অযথাই কাউকে মন্দ বলতে হয়।’ তার বউ বলত – ‘তোমার চাচা ঠিক কথায় বলেছে বাবা।’

 

 

প্রশ্নপদ্ম

গাছের পাতাগুলোকে আমার মাছের মত মনে হয়েছিল এবং গাছকে আমি নদী বলে ডেকেছিলাম – সাড়া পাইনি।

জলের ভেতরে মাছগুলোকে আমার পাতার মত মনে হয়েছিল এবং নদীকে আমি গাছ বলে ডেকেছিলাম – সাড়া পাইনি।

পদ্মফুলকে আমার নারীর মত মনে হয়েছিল এবং পদ্মকে আমি নারী বলে ডেকেছিলাম – সাড়া পাইনি।

বাঘকে আমার পুরুষ মানুষের মত মনে হয়েছিল এবং বাঘকে আমি পুরুষ মানুষ বলে ডেকেছিলাম – সাড়া পাইনি।

নারীকে আমার পদ্মফুল মনে হয়েছিল এবং নারীকে আমি পদ্ম বলে ডেকেছিলাম – সাড়া পেয়েছি।

পুরুষ মানুষকে আমার বাঘের মত মনে হয়েছিল এবং পুরুষকে আমি বাঘ বলে ডেকেছিলাম- সাড়া পেয়েছি।

মানুষ মূলত মানুষ বাদে আর সবকিছু।

 

মরাবিড়াল

প্রায় পোষা একটা বেড়াল মরে গেল।
বিড়ালটা মাছ খুব পছন্দ করত।
পাশের বাড়ির ছেলেটাকে বললাম – ‘বাছা,
মরা বিড়ালটা ফেলে দিয়ে এসোতো,
তোমাকে চকলেট কেনার পয়সা দেব।’
ফিরে এসে ছেলেটা বলল – ‘ফেলে এলাম
পুকুরে। এবার চকলেট কেনার পয়সা দেন।’

পরদিন, হেঁটে যেতে হচ্ছিল পুকুর পাড় দিয়ে।
ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে পুকুর ধারে।
তাকে দেখে বললাম – ‘বাপুহে, বিড়ালটা যে
ফেলতে বলেছিলাম, ফেলেছিলে কি?’
‘জ্বী চাচা’ – ছোট পরিপূর্ণ উত্তর।
সন্দেহে বললাম – ‘তবে মৃতদেহের বিড়ালকে
পুকুরের কোনো কোণে কেন দেখি না?’
নিঃসন্দেহ মাখা স্বরে বালক বলল – ‘খেয়ে ফেলেছে মাছেরা।’

 

 

মৃত্যমাখা পোশাকপাখি ও শেয়াল ভবন

[যাঁদের শ্বাস আঁটকা পড়েছিল রানা প্লাজার লোহার পাঁজরে তাঁদের প্রতি]

তোমরা মাছ। তোমরা একঝাঁক মাছ ছিলে। মৃত্যুর জালে দলে দলে ধরা পড়লে। তোমাদের মৃতদেহ নিয়ে দারুণ এক উৎসব হচ্ছে শেয়াল ভবনের অন্দর আর বাহির মহলে।

বেশ ভাল হলো। যন্ত্রণার দামে কিনে নিলে শান্তির বাস। আপাতত তোমাদের শান্তি যে, তোমাদের আর মার্কামারা কাগজে নীলসিল হয়ে ব্যালট বাক্সে ঢুকতে হবে না।

তোমরা পোশাকপাখি। নিজেদের এক একটা পালক খুলে খুলে, পোশাক গড়ে, রঙ্গিন করতে নগ্ন চারপাশ।

তোমরা এখন মৃতপাখি, তোমরা দারুণ যন্ত্রণা মাখা পাখা নিয়ে উড়ে গেলে।

এ এক ভাল, এ এক নৃশংস আনন্দ করে নিলে শেয়াল ভবনের সাথে। তোমরা আর ভোটারপাখি থাকলে না। তোমরা আর ব্যালটপেপার নও। তোমরা আর সরকারি নও। তোমরা আর বিরোধী নও। তোমরা আর রানা প্লাজার ফাঁক-ফোকরে থাকা পোকা-মাকড় নও।

তোমরা এখন পৃথিবীর বাসিন্দা থেকে হৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে গেলে…