কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

বিজ্ঞান প্রযুক্তি ডেস্ক: আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা । শুরুটা দেখতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৫৬ সালে। ডার্টমুথ কলেজের একদল গবেষক দেখতে চেয়েছিলেন যন্ত্রপাতি মানুষের মতোই কাজ করতে ও সাড়া দিতে পারে কি না। তাঁরা ধরে নিয়েছিলেন, যন্ত্রকে সঠিক নির্দেশ দিতে পারলে তারা মানুষের মতোই যুক্তি ও বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কাজ করতে পারবে। আর এ থেকেই এসেছে আজকের অ্যাপলের সিরি, কিনিট (থ্রিডি গেমিং ইন্টারফেস), আইবিএমের ওয়াটসন, আমাজনের অ্যালেক্সা, গুগলের গুগল নাও মাইক্রোসফটের করটানা ও ফেসবুকের এম । ২০১৩-এর ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্বের প্রথম বায়োনিক মানুষ রেক্স-এর আবিষ্কার হয়। কৃত্রিম অঙ্গ, রক্ত ও রোবোটিক হাত-পা আছে এর। রেক্স হাঁটতে পারে, শুনতে পায় এবং বুদ্ধিমত্তা সহকারে কথোপকথনও চালাতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) কম্পিউটার বিজ্ঞানের একটি শাখা, যেখানে মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তা শক্তিকে কম্পিউটার দ্বারা অনুকৃত করার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন হয়ে উঠেছে একটি একাডেমিক শিক্ষার ক্ষেত্র যেখানে পড়ানো হয় কিভাবে কম্পিউটার এবং সফটওয়্যার তৈরি করতে হয় যা বুদ্ধিমত্তা প্রদর্শন করবে।

চিন্তাশীল যন্ত্র আর কৃত্রিম সত্তার দেখা পাওয়া যায় গ্রীক উপকথা সমূহে, জাবির ইবন্ হাইয়ান, জুডা লৌই ও পারাক্লিসাস পর্যন্তও কৃত্রিম সত্তা তৈরি করেছিলেন। উনবিংশ ও বিংশ শতকে তো গল্প সাহিত্যে কৃত্রিম সত্তা একটা খুবই সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল।
দার্শনিকগণ এবং গণিতজ্ঞেরা সুপ্রচীন কাল থেকেই যান্ত্রিক অথবা “আকারগত” যুক্তিকৌশল গড়ে তুলেছেন । অ্যালান টুরিং এবং আরো অনেক গণিতজ্ঞের কাজের উপর ভিত্তি করে তর্কবিদ্যার অধ্যয়ন তো সরাসরিই নিয়ে গেছে প্রোগ্রামেবল ডিজিট্যাল ইলেকট্রনিক কম্পিউটারের আবিষ্কারের মধ্যে। টুরিং এর থিওরি অব কম্পিউটেশন এ প্রস্তাব করা হয়েছিল যে, কোন যন্ত্র, স্রেফ ০ আর ১ এর মত সরল প্রতীক সমূহ ঘেঁটেই যে কোন বুঝতে পারার মত গাণিতিক উপপাদ্যকে অনুকৃত করতে সক্ষম। স্নায়ুবিদ্যা, ইনফর্মেশন থিওরি ও সাইবারনেটিক্সএর ক্ষেত্র সমূহে সমসাময়িক সহগামী আবিষ্কার গুলি সহ এটাই , গবেষকদের একটা ছোট দলকে অনুপ্রাণিত করল ইলেকট্রনিক মগজ তৈরির সম্ভাব্যতার বিষয়টি নিয়ে গুরতরভাবে বিবেচনা করা শুরু করতে।

১৯৫৬ সালের গ্রীষ্মে ডার্টমাউথ কলেজ ক্যাম্পাসের এক সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণার ক্ষেত্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়। উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ,যাঁদের মধ্যে ছিলেন জন ম্যাককার্থি, মার্ভিন মিনস্কি, অ্যালেন নিউওয়েল আর হার্বার্ট সাইমন এঁরাও, এঁরাই পেয়ে গেলেন পরের বেশ কয়েক দশকের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণার ক্ষেত্রের নেতৃত্ব। তাঁরা ও তাঁদের ছাত্ররা এমন সব প্রোগ্রাম লিখলেন যেগুলো, বেশির ভাগ মানুষের কাছেই, স্রেফ অদ্ভুত ব্যাপার: কম্পিউটারেরা বীজগণিতে ভাষায় প্রকাশিত সমস্যার সমাধান করে দিচ্ছে, যৌক্তিক উপপাদ্য প্রমাণ করে দিচ্ছে, এমনকি ইংরাজীতে কথাও বলছে।১৯৬০ এর দশকের মাঝামাঝি নাগাদ,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা চলতে লাগল ডিপার্টমেন্ট অব ডিফেন্স এর মোটা অনুদানে আর গোটা পৃথিবী জুড়েই গবেষণাগার স্থাপিত হতে লাগল। কৃত্রিম বুদ্ধমত্তা ক্ষেত্রটির স্থাপিয়তারা এই নতুন ক্ষেত্রের ভবিষ্যত্ বিষয়ে সুগভীর ভাবে আশাবাদী ছিলেন: হার্বার্ট সাইমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, “বিশ বছরের ভিতরেই , এক জন মানুষ যা যা করতে সক্ষম তার সবই যন্ত্রেরা করতে সক্ষম হয়ে যাবে” আর মার্ভিন মিনস্কিও একমত হয়েছিলেন এই লিখে যে, “এক প্রজন্মের ভিতরেই … ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ বানানোর সমস্যাটি প্রায় সবটাই সমাধা হয়ে যাবে।”

দুর্ভাগ্যবশতঃ, যে সব সমস্যার সম্মুখীন তাঁরা হয়েছিলেন তাদের কয়েকটির স্বরূপ তাঁরা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে, স্যার জেমস লাইটহিলএর এক সমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের কাছ থেকে আরও বেশী কাজের কাজে টাকা ঢালবার জন্য আসতে থাকা ক্রমাগত চাপের মুখে পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবং ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের উভয় সরকারই AI ক্ষেত্রে অনির্দিষ্ট লক্ষ্যাভিমুখী আর কেবলমাত্র রহস্য উন্মোচনাত্মক সমস্ত রকম গবেষণাতে রসদ দেওয়া থেকে হাত গুটিয়ে ফেলল। পরবর্তী কয়েকটা বছরকে, যে সময়টায় ঐ সব প্রকল্প গুলোর জন্য টাকা পাওয়াই মুশকিলের ব্যাপার হয়ে গেল, সেই সময়টাকে অনেক পরে বলা হবে “AI winter” অর্থাত্ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শীতের দিন ।
চাকা ঘুরে গেল ১৯৮০ এর দশকের গোড়ার দিকে। এসে গেল এক্সপার্ট সিস্টেম বা বিশেষজ্ঞ তন্ত্র। তুমুল ব্যবসায়িক সাফল্য পেল সেটা। আর তারই জোয়ার লেগে AI এর গবেষণা পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠল। এই এক্সপার্ট সিস্টেম ব্যাপারটা আসলে কিছু না, এক ধরণের AI প্রোগ্রাম, যা এক বা একাধিক বিশেষজ্ঞ মানুষের জ্ঞান আর দক্ষতার ভাণ্ডারকে নকল করতে পারে। ১৯৮৫ সাল নাগাদ AI এর বাজার এক শ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেল। একই সঙ্গে, জাপানের পঞ্চম প্রজন্মের কম্পিউটার প্রকল্প সমূহ মার্কিন এবং ব্রিটিশ সরকারকে অনুপ্রাণিত করল ঐ ক্ষেত্রে শিক্ষাগত গবেষণায় পুনরায় টাকা দেওয়া শুরু করল । সে হলে কি হয়, ফের ১৯৮৭ সালে লিস্প মেশিনএর বাজারের ভেঙে পড়া দিয়ে শুরু হয়ে AI এর ক্ষেত্রটি পুনরায় দুর্নামের মধ্যে পড়ল। শুরু হল দ্বিতীয় আর এক, দীর্ঘতরভাবে স্থায়ী AI শীত।

১৯৯০ এর দশক জুড়ে আর একুশ শতকের গোড়ার দিকে, AI লাভ করল তার সর্বোচ্চ সাফল্য, যদিও তা কিছুটা পর্দার আড়ালেই থেকে গেল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার হতে লাগল সরবরাহ, তথ্য অনুসন্ধান, চিকিত্সার মত ক্ষেত্রে। এছাড়াও সারা প্রযুক্তি শিল্প জুড়ে আরো নানা ক্ষেত্রে। এই সাফল্যের অনেক গুলো কারণ ছিল।
১১ ই মে ১৯৯৪, ডীপ ব্লু নামে এক প্রথম দাবাড়ু কম্পিউটারের উদয় হল যে তখনকার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান গ্যারি ক্যাস্পারভকে পরাজিত করতে সক্ষম হল। ২০০৫ এ, স্ট্যানফোর্ড জাত এক রোবট এল যে মরুভূমির এক না দেখা পথে স্বয়ংক্রিয় ভাবে চলে ১৩১ মাইল পরিভ্রমণ কর DARPA গ্র্যাণ্ড চ্যালেঞ্জজিতে নিল। এর দু বছর পর, CMU থেকে একটি দল এক শহুরে পরিবেশে স্বয়ংচালিত হয়ে ৫৫ মাইল পথ সমস্ত রকম ট্রাফিক নিয়মকানুন মেনে আর সমস্ত রকম ট্রাফিক ঝঞ্ঝাট অতিক্রম করে জিতে নিল DARPA আর্বান চ্যালেঞ্জ। ফেব্রুয়ারী ২০১১ তে , জিওপার্ডি! ক্যুইজ় প্রদর্শনী নামের একটি একজ়িবিশন ম্যাচে, আই বি এম এর ওয়াটসান নামক প্রশ্নোত্তর যন্ত্রটি, ব্র্যাড রুটার আর কেন জেনিংস নামের দু জন সব সেরা “জিওপার্ডি!” চ্যাম্পিয়নকে শোচনীয় ভাবে পরাজিত করল ।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণার মুখ্য সংজ্ঞাটি কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে চলছে।

SHARE