গাজী হানিফ-এর গল্প একজন মানুষ

আলোতে অন্ধকার দূর হয়। তার জ্ঞানের আলো। দ্যুতি ছড়ায়। অতিমাত্রায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে তার অগাধ পান্ডিত্য। তিনি আর কে হবেন, মাহতাব চৌধুরী।
তাকে দেখলেই মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতে হয়। তিনি আর অন্য দশজনের থেকে এতোই আলাদা, অনন্যসাধারণ। গায়ে তার সাদা শার্ট, মাথায় কোকড়ানো চুল, চোখে চিকন চশমা।
তার বাচনভঙ্গি নাটকীয়, তবে মন কেড়ে নেয়। বয়স পড়েছে, এখনও শরীরে সুঠাম। অভিজাত বণেদি পরিবারে জন্ম। তার সবটুকু মিলিয়ে সর্বাঙ্গসুন্দর মানুষ।
এই মানুষটিকে বোঝার চেষ্টা করলে সম্পূর্ণ বুঝে ওঠা যায় না। তার স্মৃতির অতলে ডুব দিয়ে যতোটুকু উদ্ধার করা গেলো ততোটুকুই গল্প। গল্প মানে রবীন্দ্রনাথের গল্পের সংজ্ঞা- ‘ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখ কথা, নিতান্তই সহজ সরল….।’ কিন্তু মাহতাব চৌধুরীর বিষয়টি এতোটুকু সহজ-সরল তো নয়ই, কঠিনের চেয়ে সুকঠিন।
বি.এ পাশ দিয়ে ইচ্ছে হলো কলকাতা বেড়াতে যাবেন। দেখবেন ঘুরে ঘুরে কলকাতার কোথায় কি আছে। অদম্য ইচ্ছেটাকে নিবৃত করার মানসে একদিন বাড়ি ত্যাগ করলেন।
বরিশাল থেকে কলকাতা। বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে। একটি রাষ্ট্র থেকে অন্য রাষ্ট্রে। তার স্বপ্নের শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ইচ্ছেমতো। ঘুরেছেন, খেয়েছেন- তার পকেটে টাকা যা ছিল তা ফতুর। হয়তো খেয়ালই করেননি এই জমিদারের ছেলে মাহতাব চৌধুরী- তার পকেটে টাকা নেই। অবশ্য খেয়াল করবেনই বা-কি, কোনোদিনই তো হাতটান ছিল না।
এখন কি করবেন তিনি ? ভাবনায় পড়েছেন। এই অচেনা-অজানা শহরে কে দেবে তাকে টাকা!
আবার ভাবতে ভাবতে এও বুঝেছেন, শুধু ভাবলেই সমস্যার সমাধান হয় না। কাজ করতে হয়। লজ্জা-শরমের বালাই ফেলে দিয়ে বড় বাজারের বড় বড় মুসলিম ব্যবসায়ীদের কাছে সমস্যার কথা খুলে বললেন। তিনি এও বললেন, আমাকে শুধু বাড়ি ফেরার খরচ টাকাটা দিন। আমি বাড়ি গিয়ে আপনার টাকা ফেরত পাঠিয়ে দেবো। শুনুন, আমি মুসলমানের সন্তান। আমার এক কথা, বিশ^াস করুন।
কিন্তু কেউ বিশ^াস করেনি। অগ্রাহ্য করেছে তাকে। যাদের কাছে এই অনুনয়ের কথা বলেছে তারা উল্টো মাহতাবের পিছনে নিন্দার ঝর তুলেছে- ‘আইছে একটা ভ্যাল লইয়া, শিক্ষিত চাটুকার’ ইত্যাদি।
এরপর মাহতাব চৌধুরী ভাবলেন, মুসলিমদের কাছে আর যাবে না। এখন হিন্দু সেজে হিন্দু ব্যবসায়ীদের কাছে যাবে। তিনি নিজের নামটা পরিবর্তন করে নাম রাখলেন সুনীল চৌধুরী। বাবার নামটাও মনে মনে হিন্দুয়ানি একটা নাম ভেবে রাখলেন। তারপর হিন্দু ব্যবসায়ীদের স্মরণাপন্য হয়ে সমস্যার আদি-অন্ত খুলে বললেন।
একজন শিক্ষানুরাগী হিন্দু ব্যবসায়ী দেখলেন ছেলেটি সুদর্শন এবং শিক্ষিত, তার মনে লেগেছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, বিয়ে করেছো বাবা ?
‘না।’ ছেলেটির মুখে এই না-বোধক শব্দটি শুনে ব্যবসায়ী মহা খুশি হয়েছেন। কেননা জহুরে জহুর চেনে, স্বর্ণকারে চেনে সোনা।

কতক্ষণ ভাব বিনিময়ে ব্যবসায়ী জ্ঞান-গরিমা, শিল্পবোধ ও চর্চা, কথায়-শব্দচয়নে সমৃদ্ধ ছেলেটিকে পেয়ে তিনি অতিশয় মুগ্ধ। তিনি মনে মনে ভাবছেন ছেলেটাকে হাতছাড়া করা যায় না। ছেলেটির মননশীল ভাষা, সাহিত্যবোধ, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম সবকিছুতে উজ্জ্বল প্রতিভার অধিকার আছে। এ ছেলে একদিন আইসিএস অফিসার হবে নিঃসন্দেহে।
সুযোগ বুঝে ব্যবসায়ী তার সুনীলকে ছেড়ে না দিয়ে তার সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে দিয়ে মেয়ের জামাতা করে রাখলেন। মাহতাব চৌধুরী এখন আর মাহতাব চৌধুরী নেই। হিন্দু সম্প্রদায়ের সুনীল চৌধুরী সেজেই হাসি-আনন্দে দিন কাটাচ্ছেন। বউয়ের ভালোবাসা, শ^শুড়-শ^াশুড়ির আদর তাকে এতটাই গভীর সমুদ্রে ডুবিয়ে রেখেছে দেশে ফেরার চিন্তা মাথায় নেই।
অল্প দিনেই হিন্দুয়ানি চাল-চলনে ও সংস্কৃতির সাথে নিজেকে মিলিয়ে ফেলেছে মাহতাব। কোথাও কেউ ধরতে পারছে না মাহতাব মুসলমান। সে এখন সুনীল, বড় বাজারের বড় ব্যবসায়ী কালাচান বণিকের একমাত্র জামাতা। আসলে কি নামে জাত বদলায় ? ভারতবর্ষে নামেরও রয়েছে সম্প্রদায়গত পরিচয়। তখন আর ‘মানুষ’ পরিচয় থাকে না, নামে ধর্ম পরিচয় মুখ্য হয়ে ওঠে।
অনেকদিন অতিবাহিত হয়েছে।
মাহতাব বাড়িতে ফিরছে না। বাড়ির মানুষ তার অপেক্ষায় প্রহর গুণতে গুণতে বুঝতে পেরেছে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। মাহতাবের দুই ভাই সিদ্ধান্ত করলো তারা মাহতাবকে খুঁজতে যাবেন। তবে এতবড় কোলকাতা শহর, ঠিকানাহীন একটা মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায়! তবু ভাইদের মন মানে না, খুঁজে দেখতে হয়।
দুই ভাই কোলকাতার বিভিন্ন জায়গায় হন্যে হয়ে খুঁজেছেন। সম্ভাবনাময় যেখানে যেখানে যেতে পারে সে জায়গাগুলো বাদ পড়েনি। তারা ভাইয়ের বর্ণনা যেভাবে দিয়েছেন এবং পুরানো উদ্ধারকরা এককপি ছবি দেখিয়েছেন, তা দেখে অনেকেই বলেছেন, আপনাদের বর্ণনার সাথে ছেলেটির মিল আছে, কিন্তু সে মুসলমান নয়। সে হিন্দু সম্প্রদায়ের। তার নাম সুনীল চৌধুরী। সে তো আমাদের কালাচান বণিকের মেয়ে-জামাতা।
দুই ভাই বুদ্ধি আঁটলেন।
তারা দু’জনে দু’টি ধূতি কিনলেন। বড় ভাই গলার পৈতা কিনলেন। তারপর ধূতি আর পৈতা পরে নিজেদের হিন্দুয়ানি নাম রেখে লোকদের কথামতো কালাচান বণিকের কাছে উপস্থিত হলেন। নমস্কার জানিয়ে বললেন, আমাদের ভাই সুনীল চৌধুরী কোলকাতা বেড়াতে এসেছিল, বি.এ পাশ করেছে। তাকে খুঁজে পাচ্ছি না। স্থানীয়রা বললো, আপনার জামাতার নাম সুনীল, সেও বাংলাদেশের। এই সুনীল আমাদের ভাই সুনীল কিÑনা, আমরা তার সাথে দেখা করতে চাই।
তারপর তারা সুনীলের আবছা ছবিটাও দেখালেন।
কালাচান বণিক ছবিটা দেখে এবং ভাইদের কথা শুনে ঠিকই বুঝেছেন এরা জামাইর ভাই। তাদের যথাসাধ্য আপ্যায়ন করা উচিত হবে। তাই তিনি তাদের আপ্যায়নের জন্য উঠে-পড়ে লাগলেন। এবং বললেন, বাবারাÑ বাসায় চলুন। আপনারা আমার আত্মীয়, দু’জনেই আমার মেয়ের ভাসুর। অতএব দূর থেকে এসেছেন, থাকবেন, ঘুরবেন-বেড়াবেন, খাবেন, তারপর যাবেন।
কিন্তু ভাইয়েরা বাসায় যেতে রাজি হলেন না। তারা আগে সুনীলের সাথে দেখা করে নিশ্চিত হয়েই তবে বাসায় যাবেন বলে তায়ই মহাশয়কে জানালেন।
অবশেষে কালাচান বণিক সুনীলের কাছে বাসায় লোক ডেকে পাঠালেন। সুনীলকে এসে ভাইদের সাথে দেখা করতে বলা হলো।

সুনীল ভাইয়েরা এসেছে শুনে দেখা করতে রাজি হলেন না। তার এক কথা- সে আর দেশে ফিরে যেতে চায় না। তার বউ বলছে- তা কি হয় ? দাদারা এসেছে, তাদের সাথে দেখা করতেই হবে। চলো, তোমার সাথে আমিও যাচ্ছি।
দুই ভাই একটি স্কুটার ভাড়া করেছেন। স্কুটারওয়ালাকে আগেই জানিয়েছেন, আমাদের ভাইকে আমরা নিতে এসেছি। তাকে তোমার স্কুটারে জোর করে নিয়ে যাবো। ভাড়া যা লাগে। তুমি স্কুটার জোরে চালিয়ে যাবে। যদি হাজারো মানুষ পিছনে দৌঁড়ায়Ñ তুমি সেদিকে তাকাবে না। স্পিড তোমার যা আছে সবটুকুই ব্যবহার করবে।
বউয়ের পীড়াপীড়িতে সুনীল ভাইদের কাছে উপস্থিত হয়েছে। তার বউ ভাসুরদের প্রণাম করতে উদ্যত হ’লে এমন সময় দুই ভাই একত্রে সুনীলকে জোর করে ধরে স্কুটারে উঠায়। তারপর দু’জনে চেপে ধরে যেন ছুটে না যেতে পারে। স্কুটারওয়ালা সবটুকু স্পিড দিলে স্কুটার সকলকে ছেড়ে চলে যায় অনেক দূরে।
মাহতাবকে দুই ভাই বাংলাদেশে নিয়ে আসে। মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় মাহতাব, ‘বাজান আর যাবি না তো কলিকাতাÑ আমারে ছুঁইয়া ক ?’
মাহতাব মায়ের কথা ফেলে দিতে পারে না। সে তার মায়ের মাথা ছুঁয়ে রাজি হয়েছে। তখন তার দু’চোখে ছিল বেদনার গঙ্গাজল।
ভাইয়েরা ধমক দিয়ে বলে, চৌধুরী বংশের ইজ্জত- আমরা মুসলমানের সন্তান, কথাটা মনে রাখিস্।
ধমক খেয়ে মাহতাবের মুখে কথা সরে না। দারুণ ব্যথা মনের মাঝে চেপে রাখেন। সাথী হিসেবে হাতে নিয়েছেন বই। বইয়ের মাঝে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে সকাল বিকেল রাত অবধি জেগে থাকেন মাহতাব চৌধুরী। তারপর স্থানীয় একটি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। সকল বিষয়ের পারদর্শিতার জন্যে তাকে অল স্কয়ার অর্থাৎ স্কয়ার স্যার বলে জানতো সকলে।
এরপর স্কয়ার স্যার লিখতে শুরু করেন। অনেকগুলো বই লিখে ফেলেন। মানুষের মাঝে অন্ধকার দূর করতে জীবন-গল্পে লিখেছেন- মানুষই হচ্ছে একটি জাত- সেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান মুখ্য হতে পারে না।
কলকাতায় বউয়ের সাথে পুণরায় যোগাযোগের কোনো সুযোগ মেলেনি তার। জানা গেছে, স্কয়ার স্যার মৃত্যু অবধি আর কোনো দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। কেননা যদি সেই মেয়ের অন্য কারো সাথে দ্বিতীয় বিয়ে না হয়ে থাকে!