শাহানারা স্বপ্না’র গল্প ‘ভোজ’

ঘুমের মধ্যে কোথা থেকে যেন দুটো হাত ওকে ধাক্কা দেয়।  ওঠ! ওঠ! আর কত ঘুম দিবি! লাফ মেরে বিছানায় উঠে বসে দুলু। চোখ কচলায়। সামনের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ঘুমের ঘোর দুচোখে। মনে মনে বোঝার চেষ্টা করে, কে ঘুম ভাঙালো। ওমনি বাইরে কেউ যেন চেঁচিয়ে উঠল,

‘ও দুলু, বাইরে আয়’!

লতুর গলা বুঝি! দুলু টপ করে বিছানা থেকে লাফিয়ে পড়ে। বাড়ির উঠোন পার হয়ে কাছারীর দিকে দৌড়ায়। কোথায় গেল লতু! এদিক ওদিক তাকায়। কেউ তো নাই। ওরা বোধ হয় অন্য কোনদিকে গেছে। যেখানেই যাক-ঠিক এখানটায় আবার আসবেই। তখন সবার সঙ্গে কথা হবে। দুলু কাউকে না পেয়ে কাছারীর বড় পুকুরের পাড় ঘেঁষে হাঁটতে থাকে। প্রতিদিন সকালবেলা দুলুর এখানে একবার আসা চাই-ই চাই। এসময় পুকুর পারটা থাকে একেবারে শুনশান। মিজু ভাইয়ের পড়ার ঘরের টেবিল ঢাকা কাঁচের মত হালকা সবুজ রঙের পানি। একবারে টান টান। দুলুর মনে হয় কাঁচের সাগর! সাগর সে কখনো দেখেনি। তবে মিজু ভাই তাকে ছবির বইয়ে ছবি দেখিয়েছে, সেই সাগরের পানি নীল। মা’র খুব ইচ্ছে দুলুও মিজু ভাই’র মত লেখাপড়া শিখবে। তাইতো রোজই সে তার কাছে পড়া শেখে। আর কিছুদিন গেলেই দুরের বড় স্কুলটায় দুলুও যেতে পারবে। পড়তে দুলুর ভালোই লাগে। মিজু ভাই দুলুকে অনেক গল্প শোনান। কত যে ছবিওয়ালা বড় বড় বই আছে মিজু ভাই’র কাছে। দুলু সেসব খুলে খুলে দেখে। বিশেষ করে তিমি মাছ, জাহাজ আর সাগরের ছবির বইটা দুলুর ভীষণ প্রিয়। সাগরের পানির ছবি গাঢ় নীল। এতটা নীল পানি হয় কখনো? দুলুর বিশ্বাস হতে চায় না। কই সদর বাড়ির বড় পুকুর কিংবা স্কুল মাঠের পর যে মসজিদের পুকুরটা, সব্বাই বলে এ তল্লাটের সবচেয়ে বড় পুকুর, সবচেয়ে নাকি মিষ্টি পানি ওটার। ওর রঙও তো এমন নীল নয়। তাহলে! বইয়ের সব ছবি দুলুর কাছে স¦প্নের মত মনে হয়।

আম-জাম, তাল বাবলা ইত্যাদি গাছে পুকুরের পাড় একেবারে ঠাসা। ঘাটের কাছটায় গাছপালা একটু কম। কয়েকটা মাথা উঁচু নারকেল গাছ সোজা মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। তাদের ছায়া পড়ে কিনার ছাড়িয়ে দুরে দুরে। মোটা একটা মাদার গাছ হেলান দিয়ে শুয়ে থাকার মত করে বাঁকিয়ে আছে পুকুরটার ওপর।  সারা গা ভর্তি বড় বড় কাঁটা। রোদ পড়লে ওর ছায়াটা পানির উপর সুন্দর একটা নকশা এঁকে দেয়। দুলু মাছ দেখার পোকা। এসময়ে পানি থাকে একদম স্থির। নি¯তরঙ্গ পানিতে ওদের আনাগোনা হাঁটা-চলা পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যায়। পাড়ের কিনারে মাছেরা মড়ার মত চুপচাপ পড়ে থাকে। স্বচ্ছ পানির নিচে মাছেদের নড়াচড়া দেখে দুলু। এ দেখার যেন শেষ নেই- দুলু দেখতেই থাকে। লাল, সাদা, কালো ছোট, বড়, চ্যাপ্টা- কত রকমের মাছ যে আছে! কে জানে কে এখানে এমনি করে এদেরকে এনে ছেড়ে দিয়েছে। আগে ওরা কোথায় ছিল? সারাদিন কেবল ঘুরপাক খাওয়া! কেবল ভেসে বেড়ানো? কেউ কি ওদের বকা ঝকা করে না? দুলুর মনের ভেতর এরকম অনেক কথার বুদ্বুদ বুড়বুড়ি দিয়ে ওঠে। মেঘের ফাঁকে সূর্যটা উঁকি মেরে রোদের পিচকারী ছুঁড়ে দিলেই মাছেরা পালিয়ে যায়, আর ওদের দেখা যায় না। ঝিকমিকে সোনালি রোদ সারাটা পুকুরে কুঙ্কুম ছড়িয়ে দেয়। ঘাটের কাছে কেউ এলেই ওরা টের পেয়ে যায়। আচ্ছা! ওদের কি কান আছে, মানুষের মত কি শুনতে পায়? সবকিছু কেমন করে টের পায়? এসব প্রশ্ন দুলুকে চিন্তায় ফেলে দেয়। মনে মনে অবাক মানে। ছোট মাছগুলি দল বেঁধে ঝাঁকে ঝাঁকে কেমন এঁকে বেঁকে ছুটে চলে। ওমন করে সাঁতার কাটা কেমন করে ওরা শিখল? শুধু লেজটুকু নেড়ে নেড়ে চোখের পলকে পালিয়ে যায়! দুলুর মনে বিস্ময়ের অন্ত নেই। মাছের জগতটা ওকে তন্ময় করে রাখে। ভীষণ ইচ্ছে করে মাছ হয়ে এমনি করে পানির ভেতর নেচে বেড়াতে!

একটু পরই এক এক করে জড়ো হতে থাকে লতু, শিপু, আনু আরও অনেকে। সবাই মিলে মৌশুমী ফল কুড়ায়। দল বেঁধে গাছের তলায় তলায় হেঁটে হেঁটে বেড়ায়। পাকা ফল-পাকুড় পেড়ে আনে। দল বেঁধে একজায়গায় বসে মনের আনন্দে খায়। দুলুও ওদের সাথে ঘোরে। তবে খুব ভোরে পুকুর পাড়ে বসে মাছেদের কান্ড-কারখানা দেখতেই তার বেশি ভালো লাগে। মাছেদের সঙ্গে সে চুপিচুপি কথা বলে। বেশি জোরে শব্দ করে না।  নইলে ওদের ঘুম ভেঙ্গে যাবে। আর তক্ষুণি টুপ করে ডুব মেরে  পুচ্ছ নাচিয়ে চলে যাবে। ওদের বাড়ি যে মাঝ পুকুরের অতল গভীরে।

দুলুদের বাড়িতে আজ হুলস্থুল কান্ড! বড় নানুবির জেয়াফত। কাল থেকে শামিয়ানা পড়েছে বাইরের দেউড়ী আর ভেতর বাড়ির উঠোনে। খেশ কুটুমদের জন্য বড় কাছারী জুড়ে নিচু চৌকি জড়ো করে তার ওপর ফরাশ পাতা হয়েছে। সদরবাড়ির বড় কাছারীর একপাশে পুকুরের ধার ঘেঁষে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী চালাঘর। গরুর গাড়ি ভর্তি মালপত্র আসছে হাট থেকে। সার সার জিনিষের স্তুপ।  আট-দশটা গরু, সাজি ভর্তি ঘি, তেল, বস্তাকে বস্তা চাল, ডাল কি নয়? দুধ জ্বাল হচ্ছে বিশাল বিশাল ডেকছিতে। খেজুরের ডাল কেটে তৈরি হয়েছে হাতা। তা দুহাতে নেড়ে কেমন ঘুটছে কারিকরের দল। কাছারী ঘরের একদিকের নীচু চৌকির ওপর বিছানো হয়েছে নতুন ফরাস, অতিথি মেহমানদের জন্য। অন্যদিকে মাটির মেঝের ওপর খড় বিছিয়ে সারি সারি লাল মাটির পাত্র রাখা হয়েছে। এর ভেতর দই পাতা হবে। এতকিছু হচ্ছে একসাথে! কত দেখবে, দেখার যে শেষ নেই! এ বাড়িতে এমন আয়োজন দুলু আরো দেখেছে বৈকি! কিন্তু এবারের জেয়াফত অন্যরকম। এতবড় আয়োজন  আর কখনো হয়নি।

শেষ রাত থেকে রান্নার কাজ শুরু। কাছারীর একপার্শ্বে বড় বড় চুলা বসানো হয়েছে। চারদিকে হাঁক-ডাকের অন্ত নেই। দুলুর মা খুব ব্যস্ত। নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই। অবাক চোখে সব দেখছে দুলু। পাকের ঘরে মা’র কাছে কাছেই ঘুর ঘুর করতে থাকে সে।

এই নানুবির কাছেই বড় হয়েছে দুলুর মা। দুলুর বাবা হঠাৎ করে মারা যাবার পর আবার এখানে নানুবির কাছেই ঠাঁই মিলেছে। দুলু জন্মাবধি বড় হয়েছে এখানেই। দুলুকে নিয়ে তার মা এখানে নিজের মত করেই থাকে। নানু তাকে নিজের মেয়ের মত স্নেহ করেছেন। গত বছর নানুবির কি অসুখ হলো আর সারলো না। নানুবির জন্য কেঁদে কেঁদে দুলুর মারও শরীর খারাপ হয়ে গেছে। সাত আট বছর বয়সের দুলু এতসব কিছু বোঝে না। লোকে যখন বলাবলি করে সেও শোনে। দুলুরও কষ্ট হয় বৈকি। নানুবির মত কেউ তো ওকে আর ‘দুলু ভাই’ বলে ডাকে না, সঙ্গে করে ঘোরে না। যখন তখন মুড়ি-মোয়া খেতে দেয় না। দুলুর কাছে নানুবিও মস্ত বড় এক মাছের মত। একটু কিছু শুনলেই মাছেরা পানির বুকে শব্দ করে আলোড়ন তুলে কোথায় হারিয়ে যায়! নানুবি বাড়িটা ভরাট করে ছিলেন, হঠাৎ কি যে হলো, চলে গেলেন।  দুলুর ভাবনা থই পায় না- কি এমন হলো! মাছেরা তো পাতাল পুরীর দেশে সবুজ প্রসাদে থাকে। নানুবি এখন কোথায় আছেন? মা অবশ্য বলেন নানুবি কাছেই আছেন, সবকিছু দেখছেন, বিশেষ করে দুলুকে। তাই দুলুর ভালো হয়ে থাকতে হবে। নানুবির ছেলে মেয়েরা বেশির ভাগই শহরে থাকে। নানু একাই দুলুর মাকে নিয়ে দেশে থাকতেন। শহরে  যেতে চাইতেন না।

কয়েকদিন ধরেই সব এক এক করে আসছেন। নানান জাযগা থেকে এসেছেন আত্মীয় কুটুম। আত্মীয় স্বজনের বাড়ি তত্ত্ব-তালাশ চলছে। দূরের যারা সেখানে লোক পাঠানো হয়েছে। কাছের দূরের বেশির ভাগ শরা-শরীয়তীরা এসে পড়েছেন। শহর থেকে এসেছে অনেকে। লোকজনের কোলাহল। আয়োজনের কমতি নেই। গতকাল শেষ রাতে গরু জবাই হয়েছে। কয়েকজন মিলে ধুচুনিতে কুটে নিচ্ছে পিয়াজ, আদা, রশুন। ধুপ-ধাপ শব্দ উঠছে। ঢেঁকিশালে পিষছে মাসকলাই। আরেকদিকে একটাল আলু ছেলা হচ্ছে। জেলেরা পুকুরে জাল ফেলে তুলেছে বিশাল আকারের রুই-কাতল মাছ। সেগুলো ভাজা হবে।  রান্নার সুগন্ধে ম ম করছে চারদিক।

পুরো বাড়ি হৈ চৈ কোলাহলে সরগরম। ভেতর বাড়ি জুড়ে জেনানাদের শাড়ি গয়নার রিনিঠিনি শব্দ আর হাসির আওয়াজ। দুলুর মহা আনন্দের দিন। শহর থেকে আসা মামা, খালারা সকলেই কিছু না কিছু এনেছেন। বিশেষ করে দুলুর উপহারের কোন কমতি নেই। জামা-কাপড় বই থেকে মায় মার্বেল পর্যন্ত ! শহুরে ক্ষুদেরা সকলেই তার পরিচিত, সবার সঙ্গেই সখ্য। ফি বছরই তারা বেড়াতে আসে, সেই সুবাদে সেও তাদের খেলার সঙ্গি হয়ে ওঠে। তাদের সঙ্গে হল্লা করে কাল অনেক রাত অব্দি জেগেছিল। ঘুমানোর কথাই আসে না। কিন্তু কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল টের পায়নি।

চড়বড় করে বেলা উঠছে। ভেতরের পুকুর থেকে বাসন- কোসন ধুয়ে এক জায়গায় করছিল দুলুর মা। দুলু মার আঁচল ধরে খাওয়ার বায়না ধরে। সেই তখন থেকে গুন গুন করছে। মায়ের আঁচলের খুঁট ছাড়ে না। মা বিরক্ত হয়ে মুখ ঝামটা মারে

-‘যা দেকি, সর তো এখন’!

অন্যদিন সকালের দুমুঠি খাওয়ানোর জন্য মা ওকে খুঁজে পেতে সারা হয়। আজ যে তার এখনি খিদে পেয়ে গেল! মা কি তার কথা ভুলে গেল! খাওয়ার কথা তো মুখেই আনছে না , উল্টো ধমকে দিল? অভিমানে সরে আসে দুলু। থাক, সে খাবেই না। রান্না ঘরের চালার পাশে মস্ত ডুমুর গাছ। ডালভরা ঝোপা ঝোপা ডুমুর ধরে। ডাঁশা ডুমুর পেকে লাল টুসটুসে হলে ঝরে নিচে পড়ে বিছিয়ে থাকে। খেতে খুব মিষ্টি। ওদিক দিয়ে যাওয়ার সময় দুলুর চোখে পড়ে ছোট একটা ডাল। সেটাকে তুলে নিয়ে মাটিতে ঠুকে রেলগাড়ির হুইসেলের  মত মুখে সিটি বাজিয়ে ছুটতে থাকে। কিছুদুর আসতেই লতু, জবা, অপুকে দেখতে পায়।  তারা খেলছে। আরে দারুণ তো! সুপুরী গাছের ডালের খোলের ভেতর জবা ডাল আঁকড়ে বসে, অপু আর লতু মিলে ডালটাকে আচ্ছাসে কষে টেনে টেনে ঘোরাচ্ছে! উঠোন জুড়ে চলছে লুটোপুটি! দুলু ছুটে যায়। মেতে ওঠে ওদের সঙ্গে। খিদের কথা মনে থাকে না। একবার ঘোরার পর অপুর পালা। কিন্তু জবা কিছুতেই উঠবে না। তাকে আরেকটা পাক খাওয়াতে হবে। কিন্তু অপুরা কিছুতেই রাজী নয়। জবাটা এমন পাজী! কোন কথা শুনবে না। রুষ্ঠ গলায় ধমকে ওঠে অপু,

-কেন,  তখন না বলছিলি তুই আগে উঠবি, এরপর আমি, তারপর লতু। যা! ওঠ বলছি!

জবা খোলের ভেতর আরেকটু গুছিয়ে বসে। পাতাসহ খোলের ওপরের দিকটা দুহাতের আঙুলে পরস্পর দৃঢ় মুঠিতে জড়ায়, সখেদে মুখ ঝামটা মারে,

-না করেছি কি? তোরাও দু’বার করে ঘুরবি, তা’হলেই তো হলো!

ওর ওঠার কোন লক্ষণ নেই। ওদিকে একেকজন দুদুবার পাক খেতে গেলে, নাহ্! অনেকটা সময়! ওরা তিনজন চোখাচোখি করে। বিদ্যুতের মত খেলে যায় একটা সংকল্প। মুহুর্তে তিন জোড়া চোখের তারায় ঝকমক করে দুষ্টু বুদ্ধি। দাঁড়া! দেখাচ্ছি মজা! দু’বার করে করে ঘোরার মজা এখুনি টের পাবি! দ্বিগুন উৎসাহে তারা তিনজন মিলে খোলটাকে প্রচন্ড শক্তি নিয়ে ধরে। জবাকে নিয়ে পাক খায়। আচমকা হ্যঁচকা টান মেরে মেরে বিদ্যুৎ গতিতে ঘোরাতে থাকে জবাকে। সে ঘূর্ণির চোটে টালমাটাল জবার হাত ছিঁটকে যায়, খোল উল্টে মুখ থুবড়ে পড়ে মাটিতে। নাক, মুখ থেঁতলে যাওয়ার আঘাতে চিল চিৎকার ছাড়ে জবা। সকালের উৎসব মুখর বাড়ির প্রাঙ্গন কেঁপে ওঠে। তাড়াতাড়ি ওরা খোল ফেলে জবার কাছে ছুটে আসে। মাটি থেকে তুলতে যায়। এখনই একটা আপোষ-রফা না করলে বড়দের কানে গেলে কারোর পিঠই আর আস্ত থাকবে না। কিন্তু ততখনে জবার মা-চাচি ছুটে আসে। তিনজনই দৌড়ে পালায়। সবার পেছনে পড়ে যায় দুলু। সেদিকে আগুন চোখে তাকায় জবার মা। সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে দুলুর ওপর। জবাকে কোলে তুলে নিয়ে পালানোরত দুলুদের দলের দিকে চেয়ে বলে,

-দাঁড়া! নাগাল পেলে তোদের কি করি দেখিস।

কাজের ফাঁকে দুলুর মায়ের হঠাৎ বুকটা ছাঁত করে ওঠে, তাইতো! দুলুর যে সকাল থেকে তেমন কিছুই খাওয়া হয়নি। ধমক খেয়ে সেই যে ছাওয়ালটা গেল, হতচ্ছাড়াটার আর দেখাই নেই। দুলুর মা কাজ ফেলে ছেলের খোঁজ করে। কোথায় দুলু-  ত্রিসীমানাতেও  তার দেখা নেই। জ্বালালে দেখছি। ভোরবেলা ঘুম ভাঙ্গার পর থেকেই দুলু পাত্তা পাওয়া ভার। তবে খিদে পেলে ঠিক এসে হাজির হয়। কিন্তু আজ ওর কি হলো! অদূরে বসে মাছ কাটা দেখছে শেফালীর ছোট্ট মেয়েটা। হাতছানি দিয়ে ডাকে ওকে-

-এই আলেয়া! কথা শুইনা যা’।

দুলুর মার ডাকে ছুটে আসে শেফালী।

-যা ত দুলু কই গেছে দ্যাখত। যেখানে পাবি, ধইরা আনবি।

আলেয়া দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ির বাইরে যায়। বাগানের দিকে ছুটতে থাকে। ধান উঠে যাওয়ার উত্তুরে ভিটে খালি পড়ে আছে। সেখানে কুচো-কাচারা খুব হল্লা করছে। দুর থেকেই কানে আসছে শোরগোল। বাড়ি ভর্তি লোকজন। এখানে সেখানে জটলা পাকিয়ে গল্প গুজবে মত্ত অনেকেই। এক জায়গায় লাট্টু ঘোরানোর খেলা জমেছে খুব। বড়বাড়ির মেহমানদের আনন্দ দিতেই লাট্টুর খেলা আয়োজন করেছেন ওপাড়ার খুররম চাচা। দুলু একপাশে দাঁড়িয়ে নিবিষ্ট মনে দেখছে লাট্টুর ঘূর্ণি। আলেয়ার দুচোখেও বিষ্ময়। সে অবাক হয়ে লাট্টু খেলা দেখতে থাকে।  ভুলে যায় দুলুর কথা।

কাছারীর মাঠ জুড়ে রঙবেরঙের শামিয়ানার নিচে গ্রামীণদের জন্য পাটির সপ বিছিয়ে দেয়া হয়েছে। দুপাশে পাটি, মাঝে খাতিমদারদের খাবার পরিবেশনের জন্য সরু খালি জায়গা।  কে বলবে এটা খেলার মাঠ! দুলু মা’র কাছে যাওয়ার জন্য বাড়ির পথে পা বাড়ালো। আরে বাস! রান্নাবান্না শেষ হয়ে গেল? সব দেখি খেতেও বসে গেছে! সারি সারি এত লোকেরা কখন এলো? দলে দলে লোক শামিয়ানার নিচে, কাছারীর ফরাশে খাবার পরিবেশনে লেগে গেছে। বালতি বালতি  ডাল, গোশত, সবজি আর বড় বড় সাজি ভরা ভাত নিয়ে দৌড়াচ্ছে। হাঁড়ি ভরা মিষ্টি আর দইয়ের ভান্ড হাতে খাদিমদাররা দ্রুত কাছারীরি দিকে ছুটে আসছে।  ওদিকে চোখ পড়তেই দুলুর পেটের ভেতর ক্ষিদের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। দুলু উর্ধ্বশ্বাসে ছুটলো। সারা বাড়ি জুড়ে কথার তুবড়ি। এত লোক, দুলুর মনে হয় যেন দরগার মেলা। প্রতি বছর দরিয়াবাড়ি দরগার মাঠে মেলা বসে। কয়েকদিন ধরে চলে। আরো অনেকের সঙ্গে দুলুর মা দুলুকেও সাথে নিয়ে যায়। সেই বিশাল মাঠের কোনো কূল কিনারা পাওয়া যায় না। শুধু মানুষ আর বাহারি জিনিসপত্র বোঝাই। অবাক চোখে দুলুর বিষ্ময়ের বাঁধ মানে না। দরগা  থেকে আসার পরের ক’দিন মেলার স্বপ্নেই বিভোর থাকে দুলুর চোখ দুটো।

মায়ের খোঁজে দুলু এদিক সেদিক ঢুঁ মারে। দেখতে পেলো না। পুকুর ঘাটের দিকে গেল। নির্ঘাত ওখানেই থাকবে। কি এলাহী কান্ড! বিরাট বিরাট তামার পাতিলগুলো পুকুরের একপাশে গাদি করেছে। ওমা! পাতিলের তলানিতে তো বেশ খানিকটা করে খাবার লেগে রয়েছে দেখছি!  দুলু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। লোভী বেড়ালের মত পাতিলের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। একের পর এক পাতিল জমছে আর দুলু  নিবিষ্ট মনে চেটে পুটে খেয়ে চলেছে।  খেতে খেতে দুলুর পেট ভারী হয়ে এল। ওইটুকু পেটে কত আর ধরে। কিন্তু দুলুর বুঝি আশ মেটে না। এদিকে কারুর নযর নেই। এখনো খাবার পালা চলছে। সব শেষ হলে তবেই এঁটো ধোয়া শুরু হবে।

দুলুর খিদে মিটে গেছে কিন্তু খাওয়ার লোভ সে সামলাতে পারল না। খেতেই থাকে। একসময়ে পেটে চিনচিনে ব্যাথা অনুভব করে। কিছু একটা যেন দলা পাকিয়ে দুলুর গলা অব্দি ঠেলে ওঠে। ভেতরটা যেন ফেটে যেতে চাইছে! টান টান পেট ফুলে ঢোল! পেটের ভেতরটা কেমন গরম লাগছে। দুলু ছুটে কলা-মুড়োর কাছে যায়। মোটা একটা কলাগাছে পেঠ ঠেকিয়ে দু’হাতে বেড়ী দিয়ে ধরে দাঁড়ায়। কলাগাছ খুব ঠান্ডা থাকে। কিন্তু না, গরমের সঙ্গে তীব্র অস্বস্তি বেড়েই চলছে। রক্তচুষে জোঁক যেমন টইটুম্বুর হয়ে ঢলে পড়ে, তেমনি দুলুর সারা শরীর ফুলে শিথিল হয়ে পড়েছে। সহসা গরম জ্বালার চোটে দুচোখে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। জ্বালা জ্বালা ব্যাথার স্রোত পেটের ভেতর ঘূর্ণির পাক তুলছে যেন। হঠাৎ পেটটা এমন চড় চড় করে ওঠে যে, দুলুর ভীষণ ভয় লাগে। সে দৌড়ে মায়ের কাছে আসতে চায়। চিৎকার করে ডাকে,

-মা, মাগো! মা কই? আঁহ্!

দুলু যে আর সহ্য করতে পারছে না! মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য প্রাণপনে ছুটতে থাকে। কিন্তু শরীর অবশ লাগে। দৌড়াতে গিয়ে পেটের ভারে পড়ে যায়। অতি কষ্টে হাঁচড়ে পাঁচড়ে ওঠে। আবার দৌড়াতে যায়। চিৎকার করে উঠতে চায় কিন্তু গলা যেন বুঁজে আসছে। স্বর বেরুতে চায় না।

-মা! মা!

পায়ের শিরাগুলো ফেটে ছিঁড়ে পড়তে চাইছে! দুলুর হাত-পাগুলো বুঝি বন্ধ হয়ে যাবে। পুকুর ঘাট থেকে বাড়ির ভেতর অব্দি আর আসতে পারে না। একফোঁটা শক্তি নেই শরীরে- কেবল তীব্র ব্যাথা!

-উহ্, মরে গেলাম!

ওর এই  কাহিল অবস্থা কারো একজনের চোখে পড়ে। সে চিৎকার করে ওঠে,

-আরে কি হলো এর? ও এমন করছে কেন?

তাড়াতাড়ি দুলুকে ধরে ফেলে। ব্যাথায় অস্থির দাপাদাপি করা দুলুর গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। খালি পেটের তাগাটা খুলতে চাইছে। তীব্র ব্যাথায় গোঙানীর মত শব্দ করছে। অস্পষ্ট জড়ানো ব্যাথা কাতরধ্বনি শোনা যায় শুধু,

-মা! তাগা তাগা কেঁটে দাও’!

ওর কোমরের কালো তাগাটা মরন ফাঁদের মত ঠেসে পেটটাকে দু’ভাগ করে দিতে চাইছে। তাগাটা কেটে দিলেই সে বুঝি মুক্তি পাবে! মর্মান্তিক চিৎকারে উৎসব মুখর বাড়ির সমস্ত কোলাহল মুহুর্তে থেমে যায়। হায় হায়! শোরগোল শুনে ছুটে আসে সকলে-

-কি হলো? কি হলো?

সব ভেঙ্গে পড়ে উঠোনে। খবর পেয়ে  পাগলিনীর মত ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুলুর মা। আর্তনাদ করে ওঠে,

-ও দুলু!  বাপজান! দুলু রে! তোর কি অইলো রে!

দুলুর মার বুকফাটা কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে উঠল। তক্ষুণি সাইকেল নিয়ে দুজনে ছোটে শহরে-ডাক্তার আনতে। কেউ তাগা কাটার জন্য ছুরির আনতে দৌড়ে যায়।

-তা- গা! তা-গা!

আহত পাখির মত ছটফট করে গড়াগড়ি মাটিতে খেতে থাকে দুলু। পেটের সব নাড়ি-ভূড়িগুলো বুঝি ফেটে চৌাচির হয়ে যাচ্ছে। অসংখ্য সূঁচ ফুটছে যেন পেটের ভেতর।

-ওরে বাপরে! গেলাম রে!

অল্প কিছুখনের মধ্যেই কাতরাতে কাতরাতে মাটি আঁকড়ে স্থির হয়ে গেল দুলুর ছোট্ট শরীরটা। একমাত্র আশার নিধিকে কোলে জড়িয়ে মাতম করতে থাকে শোকাতুরা মা। সব হারানো দুলুর মার হৃদয় বিদারক আর্ত চিৎকার শোনা যায় বহুদর পর্যন্ত,

-ওরে আমার দুলু রে-এ-এ-এ!