সুকান্ত কুমার হৃদয়ের গল্প ‘মানিকের পতাকা’


গরম চাকু দিয়ে গুলিটা বের করতেই সজীবের পা দিয়ে গলগলিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করলো। দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রণা সহ্য করার আপ্রাণ চেষ্টায় সজীব। খলিল খানিকটা হলুদ লাগিয়ে দিলো ক্ষততে। যন্ত্রণা দাঁতে চেপে রাখতে পারলো না সজীব। অস্ফুট কণ্ঠে ‘মাগো’ বলে নেতিয়ে গেলো।

রক্ত পড়া অনেকটাই থেমে গেছে। কিন্তু ব্যথায় নড়াচড়া কষ্টকর। গায়ে অনেক জ্বরও। একটা কলাপাতায় মুঠোখানেক চাল ভাজা আর দুটো ওষুধ এনেছে খলিল। বললো- এই কয়ডা চাবাইয়া বড়ি দুইডা খাইয়ালন ভাইজান। ব্যতা কুইম্মা যাইবো। বড়ি দুটো খেয়ে আবার খড়ের উপর পাশ ফিরলো।

সজীবের বাড়ি ফরিদপুরে। সোনাপুর গ্রামে ছড়িয়ে আছে তার যতো স্মৃতি। বিধবা মা আর সুখির কথা মনে পড়ে তার।

এই তো সেদিন। সুখিকে ঘরে এনেছে সে। এরই মাঝে এগারো মাস হয়ে গেছে। সজীবের বুক চিরে গরম শ্বাস বেড়িয়ে আসে।

বিয়ের মাস খানেকের মধ্যে নতুন অতিথির  সংবাদ জানায় সুখি। সজীবের সে কি আনন্দ। সংবাদে ঘর জুড়ে আনন্দের বান ভাসে যায়। মায়ের সামনে বোকা বোকা লাগে ওকে। বলে, ‘মা, এক বাজান আমারে থুইয়া গেছে, আরেক বাজান আইতাছে। হে হে হে…’
মা বোঝেন সব। খুশি হন। হাসতে হাসতে বলেন, ‘তোর বাজান আইবো, না মায়ের সতীন আইবো ক্যামনে বুঝলি ?’
– না মা, আমার বাজান আইবো বাজান!
এরই মাঝে দেশের পরিস্থিতি খুবই খারাপ হয়ে গেলো। যুদ্ধ শুরু হলো। চারিদিকে যুদ্ধ। সজীবের যুদ্ধে যাবার কথা শুনতেই সুখির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। কিন্তু সজীব সিদ্ধান্তে অটল। মা কান্নায় ভেঙে পরলেন।
– বাজান তুই যাইস না। ঘরে একটা পোয়াতি বউ, এই সময় তোর ওর কাছে থাকোন দরকার।
– মা আমিতো এক্কেরে চইল্লা যাইতাছি না। যুদ্ধ থেইকা আমার মানিকের জইন্যে পতাকা নিয়াসুম। আমার মানিক বড় হইয়া যদি জানে, আমার দ্যাশের বিপদে আমি কাপুরুষের নাহান ঘরে বইয়া রইছি আমার মানিক আমারে ঘেন্না করবো মা।
– মায়ের চোখের জল মুছে দিয়ে বলল সজীব।
– মা তুমি আর আমারে বাঁধা দিও না। আমারে দোয়া কইরা দাও, আমি যানি আমার মানিকের জইন্যে পতাকা লইয়াইতে পারি।
– মা কিছু বলতে পারে না আর। মুখে আচঁল চেপে পাশের ঘরে চলে যায়।
– সুখি সাবধানে থাইকো। তোমার বাজান নিতে আইলে, মায়রেও তোমার লগে নিয়া যাইয়ো।

সুখি কিছু বলে না। তার চোখে অঝোর ধারা দেখে সজীব বলে, ‘আরে ! পাগলিডা দেহি কান্দে। এমন কইরো না, আমারে হাসি মুখে বিদায় দাও।’

সুখি ফুঁপাতে থাকে। কান্না থামে না। নিচু স্বরে বলে. ‘কবে আইবেন?’

সাথে সাথে উত্তর দিতে পারে না সজীব। দীর্ঘশ্বাস ফেলে। একটু দম নিয়ে বলে, ‘জানি না! তয় আমার মানিকের জইন্যে পতাকা না নিয়া আসুম না। সুখি আমারে ক্ষমা কইরা দিও। আমি যদি নাও আইতে পারি আমার মানিকেরে কইও- আমি ওর জইন্যে পতাকা আনতে গিয়া হারাইয়া গেছি।
সুখি হুঁহুঁ করে কেঁদে উঠলো।
এইভাবে কাইন্দো না সুখি। আমারে হাসি মুখে বিদায় দাও। আকাশ পরিস্কার হইয়া যাইতাছে। সুখি চোখ মুছে বললো-
যান, আফনের মানিকের জইন্যে তাড়াতাড়ি পতাকা নিয়াইসেন।
আর দেরি করেনা সজীব। ওর মাকে সালাম করে, হাতে একটা টর্চ লাইট নিয়ে বেড়িয়ে পরে। বিধবা মা আর সুখি দুজনে মুখে আঁচল চেপে সজীবের দিকে চেয়ে থাকে। এক সময় টর্চের আলোটা দূরে মিলিয়ে যায়।
প্রশিক্ষণ শেষে সজীবকে নয় নম্বর সেক্টরে পাঠানো হয়। আট মাস প্রায় শেষ, এখনো যুদ্ধ চলছে। সবক’টা অপারেশনেই ওরা জয় করে আসছে। শুরুতে যারা ছিলো, তাদের অনেকেই নেই। সাতাশ জনের মধ্যে এখন ওরা এগারোজন। আজ যে অপারেশনে গিয়েছিলো, তাতে কোনঠাসা হয়ে পড়েছিলো সজীবরা। জীবন বাজি রেখে সামনে এগিয়ে যায় সজীব। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি সৈন্যদের হটিয়ে দিতে পারলেও দুটি গুলি লেগে যায়। একটি হাঁটুতে, অন্যটি পাঁজর ছিঁড়ে বেড়িয়ে যায়। জ্ঞান হারিয়ে মরার মতো পড়ে থাকে সজীব। এক পর্যায়ে দুই সহযোদ্ধা ওকে শিবিরে নিয়ে আসে।
সজীবের জ্বর আরো বাড়লো। প্রলাপ বকছে। মুখ দিয়ে শুধু একটি কথা, ‘আমি পতাকা নিয়া আইতাছি মানিক, পতাকা নিয়া আইতাছি।
সকালে কমান্ডার আসলেন। সজীবের অবস্থা জানতে চাইলেন। খলিল ‘ভালো না বলে জানালো।’ ‘যে কোনো সময় যে কোনো কিছু ঘটতে পারে। রাতে অনেক জ্বর এসেছিলো’ শুনে কম্ন্ডারকে চিন্তিত মনে হলো। খলিল আবার বললো, ‘জ্বরের ঘোরে আবল-তাবল কইছে। ও বাড়ি যাইতে চায় স্যার।’
কমান্ডার সজীবের কপালে হাত দেয়।  শরীর পুড়ে যাচ্ছে। সজীবকে ডাকেন। খুব দূর থেকে কোনো শব্দ যেনো সজীবকে টানছে। খুব নিচু স্বরে বলে, ‘জ্বী!’। তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ।

কমান্ডার আবার ডাকলেন,
– সজীব? সজীব?

সজিব এবার সাড়া দিলো? তার চোখে মুখে জিজ্ঞাসা,
-এ্যাঁ, আমরা স্বাধীন হইছি স্যার?
ছেলেটার দেশপ্রেমে থমকে যান কমান্ডার। পোয়াতি বউ রেখে পতাকার জন্য ও এসেছে। স্বাধীন পতাকা নিয়ে যাবে বাড়িতে। খবর জানেন কমান্ডা। যে কোনো অপারেশন শেষে গল্পে মাতে থাকতো তারা।  তখনই জেনেছেন সব।

দেশকে কতটা ভালবাসলে সন্তান সম্ভবা স্ত্রীকে রেখে যুদ্ধে যেতে পারে মানুষ! নিজের স্ত্রীর চেহারাটা চোখের সামনে ভাসতে থাকে কমান্ডারের। কিছুক্ষণের জন্যে একটা ঘোরের মধ্যে চলে যান।
‘স্যার কইলেন না ? আমরা স্বাধীন হইছি ?’ সজীবের প্রশ্নে বাস্তবে ফিরে আসেন কমান্ডার।
– না। তবে খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবো। সময় সেটাই বলছে। শত্রুরা সব কোণ ঠাঁসা হয়ে পড়েছে সজীব। তুমি স্বাধীন পতাকা পাবা। আমরা পাবো। তারপর বললেন, ‘বাড়ি যাবে সজীব?’
সজীব মাথা নেড়ে বলে, সুখির কথা খুব মনে পড়তাছে স্যার।
-আচ্ছা আজকেই তোর যাবার ব্যবস্থা করা হবে।
ঘর থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছিলেন কমান্ডার।
-স্যার আমারে একটা জিনিস দিবেন?
-কী?
-একটা পতাকা দিবেন? মানিকের জইন্যে নিয়া যাইতাম।
-আচ্ছা নিস।
বাইরে এসে কমান্ডার খলিলকে বললেন-
সজীবের বাড়ির ঠিকানা জানো?
– জানি স্যার।
-সজীবকে বাড়ি দিয়ে আসো। ওকে বাড়ি পৌঁছে তুমিও বাড়ি যেও।
-আইচ্ছা স্যার।
হেসে উত্তর দেয় খলিল।
শিবিরের সবাইকে বিদায় জানিয়ে গরুর গাড়িতে ওঠে খলিল। সজীব ধরে তাতে শুইয়ে দেয়া হয়।  কমান্ডার এসে সজীবের কপালে একটা পতাকা বেঁধে দেন। সজীবের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সাথে কমান্ডারেরও।

গরুর গাড়ি এগিয়ে চলে। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে তিনদিন পরে সজীবের বাড়ি পৌঁছে। কিন্তু বাড়িতে কাউকে খুঁজে পায় না খলিল। একজন জানায়, সুখির বাবা সুখিকে নিয়ে গেছে। খলিলের মা ভিটে ছেড়ে যেতে রাজি হননি। ছেলের পথ চেয়ে থেকেছেন। একদিন রাজাকারের দল আসে। রাজাকার লিডার তসলিমের নেতৃত্বে তাকে ধারে নেয়া হয় ক্যাম্পে। ছেড়েও দেয়া হয়। অসুস্থ অবস্থায় ঘরে পড়ে ছিলেন। তারপর একদিন আগুন লাগিয়ে দেয় ওই বদমায়েশেরা। আগুনে পুড়ে মারা যান তিনি। খলিলের চোখ বেয়ে জল নামে। সজীবের কাছে গিয়ে সে জল লুকায়।

সুখিদের বাড়ি এখনো অনেকদূর। যেতে প্রায় চার ঘন্টা লাগবে। সজীবের অবস্থাও নাজুক হচ্ছে। কাল রাত থেকে চার-পাঁচ বার বমি হয়েছে। গায়ে জ্বরও আছে অনেক।
খলিল লোকটার কাছ থেকে সুখিদের বাড়ির ঠিকানা নেয়। গাড়িতে ঘুমিয়ে সজীব। ঘুমন্ত সজীবকে নিয়ে এগিয়ে চলে খলিল।
সুখির বাড়ি যখন পৌঁছে, তখন ভর দুপুর। সজীবের শ্বশুর এগিয়ে আসেন। অসুস্থ জামাতাকে দেখে ডুকরে ওঠেন। পরে সামলে নেন। খলিল ও তিনি ধীরে নামান সজীবকে। হুঁস নেই সজীবের। অন্যদিকে সুখির প্রসব বেদনা উঠেছে। সবাই সেদিকে ব্যস্ত।

খলিল সজীবের পাশে বসে চার ব্যাটারির রেডিওটা ছাড়ে। রেডিওতে খবর শুনেই খলিল উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। তার
চোখমুখে ছড়িয়ে পড়ে খুশির আভা। সজীবকে ডাকে
সজীব ভাই? সজীব ভাই? ও সজীব ভাই…

হালকা আওয়াজে উত্তর নেয় সজীব, ‘হু’
-ভাই দ্যাশ স্বাধীন হইছে। আমরা বিজয় পাইছি। সকালে পাক বাহিনীরা রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পন করছে।

সজীবের চোখ মুখ বড় হয়ে যায়। উচ্ছ্বাসিত চোখে চারিদিক তাকায়। সম্পূর্ণ সুস্থ মনে হয় তাকে। কী যেন বলতে চায়। তখনই, আজানের শব্দ ভেসে আসে। খলিল চেঁচিয়ে ওঠে- ভাই তোমার পোলা হইছে। সজীব ‘আল হামদুলিল্লাহ্’ বলে। পরে খলিলের দিকে তাকায়।
-খলিল ভাই মায়রে একটু ডাইকা লইয়াও।
খলিল চুপ চাপ বসে থাকে।
– কি হইলো খলিল ভাই? মায়রে একটু ডাক দাও।
– কোন হান দিয়া ডাইকা আনমু? হেয় আমাগো থুইয়া অনেকদূরে গেছে গা!
– ও, মায় নাই?  আমারে থুইয়া গেছে গা! নির্লিপ্ত কণ্ঠ তার। চোখ দিয়ে শুধু পানি গড়িয়ে পড়ে। তারপর জ্ঞান হারায়।

কিছুক্ষণ পরে জ্ঞান ফেরে সজীবের। আবারো দুবার বমি করে। শেষবার বমি করেই শ্বশুড়কে ডাকে। বলে, ‘আব্বা আমার মানিকেরে লইয়াসেন। আমি একটু ওর চাঁদমুখ খান দেহি। দেরি কইরেন না আব্বা। আমার ক্যামন জানি লাগতাছে। আমার সময় শেষ হইয়া আইতাছে আব্বা।’
মানিককে নিয়ে আসেন তিনি। সাথে সুখিকেও আনা হয়। সজীবকে দেখেই মুর্চ্ছা যায় সুখি। পানির ঝাপটায় জ্ঞান ফেরে। খুব চেনা ভয়ে কাঁদতে থাকে। সজীব সুখির দিকে তাকায়। তারপর আবার চোখ ফেরায় মানিকের দিকে। শুয়ে শুয়ে ছেলেকে কোলে নেয়। বুকের ব্যাথায় একবার কেঁকিয়ে ওঠে। আবার শান্ত হয়ে যায়। মানিক যেনো তার কোল জুড়িয়ে দেয়।
সব খুশি সজীবের। এগালে চুমো, ওগালে চুমো, কপালে চুমো। যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে সজীব। নিজের কপাল থেকে পতাকা খুলে ছেলেকে জড়িয়ে নেয় পতাকায়। স্বাধীন লাল সবুজের পতাকা। তারপর ছেলেকে কোলে নিয়ে তারপর চুপ হয়ে যায়।

খলিল চঞ্চল হয়ে ওঠে। সজীবকে ডাকে, ‘সজীব ভাই! সজীব ভাই!’
কিন্তু সজীবের কোন সারা নেই। কী ঘটেছে তা বুঝতে পেরে খলিল চিৎকার দিয়ে ওঠে, ‘সজীব ভা——ই!’
সুখি ঠোঁটে আঙুল চেপে বলে, ‘ইসস… চুপ! উনি ঘুমাইছেন!’