ইলিশ
ওয়াসিম হোসেন

পাখির কলতানে ঘুম ভাঙলো কেয়ার। সকালটা তার কাছে খুবই আনন্দের। আজ সে প্রথমবারের মতো স্কুলে যাবে। তাই মনের মধ্যে অনেক কল্পনা। গরিবের সংসারে জন্ম। তাই নিজে নিজে অনেক কাজ শিখে নিয়েছে সে। তার মধ্যে একটি স্নান ।

স্নান শেষে জামা কাপড় পরে স্কুলের জন্য তৈরি হয়ে নিলো। প্রায় সকালেই তার খাওয়া হয় না। হয় না মানে খাবার থাকে না। কিন্তু আজ তার মা পান্তার সাথে কয়টা শুকনো মরিচ পোড়া নিয়ে এগিয়ে এলো। কেয়ার আনন্দের শেষ নেই। খেয়ে দেয়ে মায়ের আঁচলে মুখ মুছে স্কুলের দিকে রওনা হলো। যদিও বাইরের জগতটা তার কাছে বেশ অপরিচিত।

বাবার হাত ধরে স্কুলের বারান্দায় পৌঁছাতেই আনন্দটা আরও বেড়ে কেয়ার। ছেলেমেয়েগুলো খেলায় মেতে আছে। ঘন্টা বাজার সাথে সাথে সবাই তাদের ক্লাসে চলে গেলো। বাবা বিদায় জানিয়ে কেয়াও ক্লাসে ঢুকলো।
কিছুক্ষণ পর শিক্ষক ঢুকলেন। হাতে একটা হাজিরা খাতা। নাম ডাকা শেষে তিনি ব্লাকর্বোডে একটা মাছের ছবি আঁকলেন। তারপর সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বলোতো মাছটার নাম কি ?’

কেয়ার মতো ছোট্ট শিশুরা কেউই বলতে পারলো না। শিক্ষক বললেন, ‘এটা জাতীয় মাছ ইলিশ। ইলিশ সামুদ্রিক মাছ। সাধারণত ডিম পাড়ার জন্য এরা নদীতে আসে।’ একজন প্রশ্ন করলো স্যার ইলিশ কি পুকুরে হয়? স্যার বললেন ‘যে নদীতে অনেক পানি ও স্রোত থাকে, সেই নদীতেই ইলিশ থাকে’। স্কুলের ঘণ্টা বেজে উঠলো। কেয়ার বাবা তাকে নিতে আগে থেকেই এসে গিয়েছিলেন। কেয়া দৌড়ে এসে বাবার হাত ধরে বলল, ‘বাবা জানো ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। আচ্ছা বাবা তুমি ইলিশ মাছ নিয়ে আসো না কেন?’

মেয়ের মিষ্টিমাখা প্রশ্ন শুনে ভেতরটা কেঁপে উঠে বাবার। সান্তনার সুরে বলে, ‘ইলিশ বড় লোকদের মাছ। আমদের জন্য না রে..।’ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেয়ের দিকে মনোযোগ দেন। হরবরিয়ে বলেন, ‘হ্যাঁ রে মা! তর খাইতে মন চাইছে? দেখিস, এবার ঠিকই তরে কিইন্ন্যা খায়ামু। চেয়্যারম্যানের কাছ থেইক্যা বেতন পাইলেই হয়। ইয়া বড় একডা ইলিশ কিইন্ন্যা আনমু।’ বাবার কথা শুনে আনন্দ বেড়ে যায় কেয়ার।
কেয়ার বাবা চেয়্যারমানের বাড়ীতে কাজ করে। মাস শেষে নয়শত টাকা মাইনে পায়। সেই টাকা দিয়ে কোন রকমে তাদের সংসার চলে।

একদিন বাজারে অনেক বড় একটা ইলিশ মাছ উঠেছিলো। খবর পেয়ে চেয়ারম্যান মাছটা কিনতে যায়। পথিমধ্যে কেয়ার বাবা কেয়াকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন । মাঝপথে দেখা গেল তাদের। বাপ মেয়ের নৈসর্গ দৃর্শ্য দেখে চেয়ানম্যানের মাথায় বিগড়ে গেলো। তাইতো বলি রোজ রোজ তুমি যাও কোথায়? তোমার এমাসের বেতন বন্ধ। দেখি কেমনে তুমি তোমার মাইয়ারে নিয়ে আলাদ্দি কর। চলো বাজারে চল। কেয়া তার বাবার সাথে বাজারে গেলো। চেয়ারম্যান বাজারের সব থেকে বড় ইলিশটা কিনলেন। মাছটি চেয়্যারমানের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পড়ল কেয়ার বাবার। এক হাতে মেয়ে আর এক হাতে মাছটি নিয়ে রওনা দিলেন তিনি। পথিমধ্যে অনেকে প্রশ্ন করছে কত ? কেয়ার বাবা হাঁফাচ্ছেন আর মিষ্টি হাসি দিয়ে উৎসাহ নিয়ে দাম বলছেন।
চেয়ারম্যানের বাড়ির রাস্তায় কেয়াদের বাড়ি। তিনি মেয়েকে বাড়িতে রেখে চেয়ারম্যানের বাড়ির দিকে ছুটলেন। বললেন, ‘তুই বাড়িত্ থাক। আমি তর জন্য রান্না করা ইলিশ মাছ নিয়া আইতাছি।’

মাছ নিয়ে গফুর মিয়া চেয়ারম্যানের বাড়িতে পৌঁছুলেন। কাজের বুয়া মাছটা রান্না করার জন্য লেগে পড়লো। আকাশটা সেদিন বেশিই কালো হয়ে গেলো। রান্না শেষের দিকে। কেয়ার বাবা তাঁকে তাঁকে রইলেন। সুযোগ বুঝে তিন পিছ মাছ সরাতে গিয়ে ধরা খেলেন। বুয়ার মুখ বন্ধ করতে পারলেন না। মেয়ের কথা বলেও বন্ধ করতে পারলেন না। খবরটা চেয়ারম্যানের কানে যেতেই তাকে ধরে আনা হলো। ব্যস্ত চেয়ারম্যান কোনো কিছু না শুনেই ঘরের মধ্যে আটকে রাখার হুকুম দিলেন। কেয়ার বাবা কিছু বলতে চাইছিলো। তিনি বললেন, ‘রাইতে হুনমু। ব্যাবাগ কাজ পইড়া আছে।’

কেয়া ইলিশ দিয়ে খাবে। বাবা বলেছেন, রান্না করা ইলিশ আনবেন। অপেক্ষায় থাকে সে। মায়ের বকা খেয়েছে, কিন্তু ভাত খায়নি। ইলিশ আনলে খাবে। কিন্তু বাবাও আসছে না। কী করছে বাবা ? আর তর সইছেনা। খিদেও পেয়েছে বেশ।

সন্ধ্যা গড়িয়ে গিয়েছে। মায়ের চোখ এড়িয়ে চেয়ারম্যানের বাড়ির পথ ধরলো কেয়া। কিছুদূর যেতেই প্রচন্ড বেগে বৃষ্টি শুরু হলো। গুড়–ম গুড়–ম আওয়াজে আকাশ কেঁপে ওঠে। এরপর বরফ বৃষ্টি ঝরতে থাকে। একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কাকভেজা হয়ে যায় কেয়া। পরে জ্ঞান হারায়।

মা কেয়াকে খুঁজতে থাকেন। কোথাও পান না। কেযার বাবাও নেই। হতবিহ্বল হয়ে পড়েন তিনি। গরিবের সংসার টর্চও নেই। মেয়েটা কোথায় গেলো। ভয় পেয়ে যান।

সকাল বেলা রাস্তার পাশে খুঁজে পান। সারা গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। হাওমাও করে কেঁদে ওঠেন তিনি। বুকে জড়িয়ে বাসায় আনেন। মাথায় পানি ঢেলে, গা মুছে দিয়ে, কপালে জলপট্টি দিয়েও জ্বর কমে না।

চেয়ারম্যান সব শোনেন। কিন্তু কেয়ার বাবাকে জানানো হয় না। তাকে ছেড়ে দেন। বুয়াকে ডেকে তিন পিছ রান্না মাছ দিতে বলেন। আনন্দে সালাম ঠুঁকে বাড়ির দিকে দৌড় দেন তিনি। কেয়াকে আজ বলবে, ‘দ্যাখ তোরে দেয়া কথা রাখছি।’ ‘মাইয়াডা নিশ্চয় খুশি হবে!’ ভাবতে ভাবতে আরো জোরে দৌড়ান তিনি।

বাসায় পৌঁছে দেখেন কেয়া ঘুমুচ্ছে। তার মা জলপট্টি দিচ্ছে। আর কাঁদছে। কেয়ার বাবাকে দেখে হাওমাও করে কেঁদে ওঠেন তিনি। কেয়ার বাবা আলতো করে কোলে নেন কেয়াকে। কেয়ার মাথা এলিয়ে পড়ে। গা ঠান্ডা। প্রচন্ড ঠান্ডা।
কেয়ার বাবা বলেন, ‘মা রে, আর ঘুমাইছ না। তর ইলিশ আনছি। রান্না করা ইলিশ। বাংলাদেশের জাতীয় মাছ।’