কামরুল ইসলাম সাঈদ‘র গল্প ‘অনুশোচনা’

কা ম রু ল  ই স লা ম  সা ঈ দ
অনুশোচনা

রাত বাড়ছে। বিশ্বমন্ডল গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তবুও রাতের তারা গুলো নিভে গেল না কেন? তারাগুলো কেন মিটিমিটি জ্বলছে? তারাও কী আমার মত ব্যর্থ? নাকি আমার ব্যর্থতা দেখে আমাকে উপহাস করবে বলে তারাও জেগে আছে আমার সাথে? অভিমানী কথাগুলো নীরবে স্মরেই দু’চোখ বেয়ে গন্ডদেশ লোনা পানিতে প্লাবিত করল রাকেশ রহমান।

আজকে তার বড় দূঃখের দিন। নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও বাবা-মা শত কষ্ট করে দেশের সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী অর্জন করার সুযোগ দিয়েছেন। মনে হয় এটাও ছিল জীবনে ঘটে যাওয়া একটা বড় ভুল। অভিজ্ঞতার অভাবে চাকরী হচ্ছে না। পকেটে যথেষ্ট আবেদনের খরচও নেই। পরীক্ষার দু’চারটা প্রবেশপত্র পেলেও বাবা ঢাকা যাওয়ার অনুমতি দেন না। আসলে পকেট ফাঁকা। এখন চাকরীতে মিনিমাম যোগ্যতা এবং ম্যাক্সিমাম উৎকোচ দিতে হয়। এই অনিয়মটাই আজ নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে।

সড়কের ধারে সাঁকোটার উপর বসে বসে সে ভাবছে । চিন্তায় পরিবর্তন এলো। মনে পড়ল সবিতার সেই মুখ খানা, সেই কথাগুলো। ‘দেখো আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। বলতে পারো আমার অমতেই ঠিক হয়েছে। আপনার পরিচয় বাবাকে দিতে চাইলে তিনি আপনার পরিচয় জানতে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন। আপনার আপত্তি অন্যখানে, একই স্কুলের ছাত্রী হওয়া। এটা কি আমার অপরাধ? দুনিয়াতে এত জায়গা থাকতে আপনি আমার স্কুলে এলেন কেন? দেখবেন এই উভয় সংকটের মধ্যে পড়ে আমি নিজেকে নিঃশেষ করে দেবো।’

একথা বলছো কেন? আমি তো তোমার স্কুলের শিক্ষক ছিলাম না। ভাগ্যের নিষ্ঠুর গন্তব্য আমাকে এখানে এনে থামিয়ে দিয়েছে। স্কুলের দ্বাদশ শ্রেণি পেরুতে তোমার এখনো তিন বছর বাকী। তাছাড়া তুমি হয়ত জানো না আমাদের গোপন সম্পর্কের বাইরে প্রকৃতি ও ভাগ্য যে সম্পর্ক তৈরী করে দিয়েছে তাতে আমাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে উঠলে তা বড় লজ্জার ও অসম্মানের হবে। দুটি সম্পর্কের দ্বিতীয়টি ছিন্ন করলে তা কী আমাদের লোকচক্ষু ও দাম্পত্যের জন্য সুখময় হবে না? তাই প্রথমটির কথা ভেবে দেখো।

আমি তোমাকে ভালোবেসেছি। আমি প্রেমের ফেরিওয়ালি নয় যে আমার প্রেমস্থল পরিবর্তন ও রকমারী গ্রাহক আবশ্যক। আপনি আমার জীবনের প্রথম প্রেম, সকল স্বপ্ন এবং শেষ ভালোবাসা। আপনার কাছে দ্বিতীয় সম্পর্কটি ছিন্ন অসম্মানের হলে প্রথমটি ছিন্ন আমার কাছে লজ্জার।

কথাগুলো রাকেশের হৃৎপিন্ডের প্রকোষ্ঠের সিস্টোল-ডায়াস্টোলকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। কম্পিত করেছিল তার কঙ্কালের প্রতিটি অস্থি-তরুনাস্থিকে। ছিন্ন করেছিল তার সবকটা অস্থি সন্ধিকে। এক অজানা আশঙ্কায় পদ তলের মৃত্তিকা কেঁপে উঠেছিল। এর পরের দিন হতে রাকেশ তার ক্লাশে স্বীয় দৃষ্টি সবিতার দৃষ্টিতে একটুও নিবন্ধিত করতে পারে নি। একটা অপরাধবোধ তাকে সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়াত। আগের মত শিক্ষাদানেও তেমন আগ্রহ বা মনোযোগী দেখা যাচ্ছে না। দিন দিন নিজেকে সংকুচিত করে ফেলছে। পক্ষান্তরে সবিতাও রাকেশের ক্লাশে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে স্যারের উত্তরের অপেক্ষায়। এ কোন প্রশ্নের উত্তর নয়, বিবেকের উত্তর। যে উত্তর হবে বহু স্বপ্নসিক্ত ও আকাক্সিক্ষত। যে উত্তর হবে দুই বিপরীত মেরুর দুটি হৃদয়কে সংযোজনের উত্তর।

বিয়ের আগের দিনগুলো যেন আর কোন মতে কাটতে চায় না। জীবনে যখন দুঃখের ছোঁয়া লাগে  সময় তখন  আর কাটতে চায় না কেন? অনাগত নেতিবাচক পরিণামের ফলই কী জীবনের দিনগুলোকে থামিয়ে দেয়? তাই বিয়ের আগের কÕটা দিনের জন্য রাকেশকে বহুদিন অপেক্ষা করতে হলো। কিন্তু সব অপেক্ষারই একদিন যবনিকাপাত ঘটে। রাকেশেরও অপেক্ষার দিন একদিন শেষ হলো।

আজ সবিতার গায়ে হলুদ। হলুদের স্পর্শে সবিতার দুধের মত শুভ্র তনুকে মোহনীয় করে তুলেছে। ঠিক যেন কাঁচা সোনা। বড়ই লাস্যময়ী দেখাচ্ছে তাকে। সবার মনেই অফুরন্ত আনন্দের ঢেউ খেলে যাচ্ছে। সবিতার বাবা মা ও আত্মীয়স্বজনেরা সবিতার অনাগত সুখ স্বাচ্ছন্দের কথা ভেবে ভেবে পুলকিত হচ্ছেন। কিন্তু দৃশ্যমান হলুদের ভেতরে অদৃশ্যমান ক্ষতে টকটকে লাল রক্তের নহর প্রবাহিত হচ্ছে যা সকলের অগোচরেই রয়ে গেল। হায় রে প্রেম! হায় রে ভালোবাসা!

আগামী পরশু বিয়ে। একথা কোনভাবে জানার পর রাকেশ কোন অজুহাতে পাঁচদিন স্কুল ছুটি নিল। সময়কে বেঁধে আর রাখা গেল না। সময় তার নিয়মে জগতের সবকিছুকে স্বাগত জানিয়ে, সব কিছুকে দলিত মথিত করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চললো।

বিছানায় শুয়ে ছটপট করছে রাকেশ। বিছানাটা আজ যেন একটা জ্বলন্ত উনুনে পরিণত হয়েছে। সেই উনুন হতে বিবেকের দহন স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে তাকে গলিয়ে দিচ্ছে অস্থিসমেত। মনে হয় আজই তার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। প্রভাত হলেই দুজনার শত চেনা পথটি চিরে দুভাগ হয়ে যাবে। বদলে যাবে চাওয়া পাওয়া ও ভালোবাসার মানুষটি। তারা দুজনার কেউই কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে নি। তাই আজ প্রকৃতিই তাদের ক্ষণকালীন সমস্যাটির চিরস্থায়ী সমাধান করে দেবে।

গভীর রাতের ঘুমের হাতছানি রাকেশকে বেশিক্ষণ জেগে থাকতে দেয় না। ক্লান্ত শরীর, বিষন্ন মন ও নির্ঘুম চোখে নেমে আসে অজানা রাজ্যের নিকশ কালো অন্ধকার। ঘুম যখন ভাঙল তখন সে নিজেকে অচেনা ভাবল। সময়ের প্রতি ভ্রুক্ষেপ নেই।

বাইরে ডাক পিয়নের কন্ঠস্বরে সে সম্বিত ফিরে পেল। রিস্ট ওয়াচে তখন বাজে বেলা সোয়া বারোটা। চারদিকের মসজিদে জুম্মার আযানের ধ্বনি প্রতিধনিত হচ্ছে। ছোট বোন মুন্নি টেবিলের উপর রাখা গৃহদাহর উপর একটা চিঠি রেখে গেল। চিঠিটার অর্ধেক বইয়ের উপরে এবং বাকি অর্ধেক টেবিল স্পর্শ করল। রাকেশ তাতে কোন আগ্রহ দেখালো না।

খামের লাল রঙের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য মনের অজান্তে রাকেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। তাতে প্রেরকের কোন নাম নেই। প্রাপকের নাম লিখেছে যে সে হস্তাক্ষর রাকেশ চিনতে পারল। সবিতা। জীবনের পরিণত বয়সের সুখ দূঃখের দিনগুলোতে সবিতা ছাড়া কারো হস্তাক্ষর এত বেশি পড়তে হয়নি তাকে। রাকেশ সবিতার নিখুঁত মুখশ্রীর বর্ণনা হয়ত দিতে পারবে না। কিন্তু সবিতার লেখা প্রতিটি বর্ণের, প্রতিটি শব্দের সে নিখুঁত বর্ণনা দিতে পারবে।

তাই সে বিধ্বস্ত শরীর ও বিপর্যস্ত মন এলিয়ে দিয়ে খামটি খুলে চিঠিখানা বের করল। চিঠির কাগজটাও খুব বিশেষ। শীতল পাটির বুননের আদলে নিখুঁত কারুকার্যের রঙিন চিঠিখানার ভাঁজের ফাঁকে থাকা গোলাপের পাঁপড়িগুলো তার প্রশস্ত নগ্ন বক্ষের উপর ঝরে পড়ল। চিঠিখানা সে পড়তে আরম্ভ করল-

প্রাণাধিক রাকেশ,
যখন তুমি এই চিঠিখানা হাতে পাবে ততক্ষণে তুমি হয়ত জেনে যাবে আমি আর নেই। খুব কষ্ট করে হলেও লিখলাম ‘আমি আর নেই’। কারণ যে পৃথিবীতে তুমি থাকবে আর তোমার পৃথিবীর বিশাল নীলিমায় বিহঙ্গের মত ডানা মেলে আমি উড়তে পারব না, বলো তাই কী হয়? তোমাকে ভালোবাসার প্রথম দিনটি থেকেই আমার হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে আসতো। হয়ত আজকের দিনটির জন্যই। তোমার জন্য আমি অনেক লিখতে পারি। তোমার জন্য অনেক দূরেও চলে যেতে পারি। তুমি হলে রাকেশ আর আমি হলাম সবিতা। তোমার ধার করা আলোর ভূবণে আমি নিজেকে তোমার প্রয়োজনে বিলীন করে তোমাকে স্থায়ী আলোকিত করে দিলাম। আমার আলো শুধু তোমার জন্য। আমার ভালোবাসাও শুধু তোমার জন্য। আর হ্যাঁ, মাঝে মাঝে মাঝরাতে তোমার জানালা দিয়ে দেখা যাওয়া হিজল ফুলের গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে তোমাকে দেখে যাব। আমার ভালোবাসায় অত্যাচারিত হয়ে জানালাটা বন্ধ করে দিওনা কখনও। আমি তোমাকে ভালোবেসে দেউলিয়া হয়ে গেলেও তোমাকে তা হতে দেব না। আমার খুব ভয় হয় আমি তো অমর হয়ে গেলাম, তুমি হয়ো না যেন! তুমিও অমর হলে আমাদের ভালোবাসার অমরত্ব আমি দেখাব কাকে বলো? আমার ভালোবাসার শোধ দিও নাকো। তোমার কোন ভয় নেই, গোপন সম্পর্ক গোপনেই থাক। প্রকৃতি ও ভাগ্যের সম্পর্ক ছিন্ন করে লজ্জায় ও অসম্মানের হাত থেকে বেঁচে থাকো। যারা গোপন সম্পর্ক গোপনেই ছিন্ন করতে পারে এমন কাউকে খুঁজে নিও। জানালাটা খোলা রেখ কিন্তু। যেন মন চাইলে তোমাকে একবার দেখে যেতে পারি।

অন্তহীন পথের যাত্রী
সবিতা

রাকেশ অপলক দৃষ্টিতে বুকের পাঁজরের ভেতরের যন্ত্রগুলোকে যথাসম্ভব  সংকুচিত করে বাকরুদ্ধ হয়ে রইল। পঞ্জিকায় রচিত লাল দিনটি এবং সবিতার লেখা চিঠি বহনকারী লাল খামখানা রাকেশের নির্বোধ বিবেককে চূর্ণ করে রক্তিম ধারায় সাগরের অতল তলে নিমজ্জিত করে দিল।