ক্যারিয়ার আড্ডা বিসিএস ক্যাডার চয়েস: অব্যয় অনিন্দ্য’র জানালায়

গতকাল ৩৮-তম বিসিএসের সার্কুলার হলো। শুরু হয়ে গেছে ক্যাডার চয়েস নিয়ে অনেক প্রশ্ন। নতুনদের কথা মাথায় রেখে আগের লেখাটিকে আপডেট করলাম। এখানে ক্যাডারগুলোর তথ্য দিচ্ছি, সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনাকেই –

এডমিনঃ ১ম কথা হল, ৯০% সচিব এডমিন থেকে হয়। শুধু পররাষ্ট্র সচিব ছাড়া সকল সচিবই এডমিন থেকে নিয়োগের ইতিহাস আছে। বর্তমানে কয়েকজন মাত্র সচিব অন্য ক্যাডারের। তাই যারা ভবিষ্যতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠতে চান তাঁদের জন্য এডমিনই ভাল চয়েস। প্রথমে একটি ডিসি অফিসে কাজ করতে হবে সহকারী কমিশনার হিসেবে। ২/৩ বছর সময়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা AC(Land) এর দায়িত্ব পাবেন। এরপর ইউএনও,এডিসি, ডিসি। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়েও সহকারী সচিব, উপসচিব… হিসেবে অনেকে কর্মরত থাকেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পোস্টিং হয়। তাই এডভেঞ্চার আছে, এটা এনজয় করতে পারলে ভাল লাগবে। মানুষের সাথে সরাসরি কাজ। তাই সত্যি যদি আপনার ইচ্ছা থাকে, মানুষের জন্য কাজ করবেন – সে সুযোগ এখানে আছে। জুডিশিয়াল সার্ভিস আলাদা হওয়ার পরে এডমিন ক্যাডার নিয়ে অনেক নেগেটিভ কথা শুনা গেছে। বিশেষত আমরা যখন জয়েন করি, তখন অনেকের মাঝে হা-হুতাশ ছিল। এখন কিন্তু সেটা শুনা যায় না। তখন ভাবা হচ্ছিল মেজিস্ট্রেসি বলতে কিছুই আর এডমিন অফিসারদের থাকবে না। আসলে তো তা নয়। যে কোন দেশেই শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এডমিন অফিসারদের বিকল্প নেই। একজন নন-আর্মড অফিসার অর্ডার করবে, আর আর্মড-পার্সনরা সেটা পালন করবে। এটাই যে কোন সভ্য দেশের নিয়ম। তাই এখন সরকারের প্রয়োজনে সহকারী কমিশনারগণ নিয়মিতই ম্যাজিস্ট্রেসি দায়িত্ব পালন করেন। মোবাইল কোর্টসহ অনেক দায়িত্বই আপনি পাবেন।

পুলিশঃ পুলিশকে সবার প্রয়োজন। তাই সরকারী চাকরি করে পরিচিতজনের কাছে কেন্দ্রবিন্দু হবার সৌভাগ্য এখন পুলিশেরই সবচেয়ে বেশী। যে যাই বলুক, আপনার মোবাইল নাম্বারটা সবার আকাঙ্ক্ষিত হবেই। আর এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাও পুলিশ ক্যাডারদের পক্ষে সম্ভব। কাউকে সরাসরি বিপদ থেকে রক্ষা বা আইনি সহায়তা তাঁদের হাতেই। তাই যারা মানুষকে সরাসরি সাহায্য করতে চান, তাঁদের জন্য পুলিশ হওয়াই আমাদের দেশে সবচেয়ে উপযোগী। আর এই সৌভাগ্যের সাথে ঝুঁকির কথাও একটু মাথায় রাখুন। দায়িত্ব পালনের জন্য ঝুঁকি নেবার সাহসটুকু থাকতে হবে। আর ফিল্ড লেভেলে কাজ করতে নেতা-কর্মীদের ম্যানেজ করে দায়িত্ব পালনের বিষয়টাও আছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পুলিশ অফিসারদের অনেকেই সুযোগ পায়। মাঝে মাঝে আপনার ব্যক্তিগত কোন দোষ না থাকলেও সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীদের গালি সরাসরি শুনতে হতে পারে। তবে সেটা আপনার আড়ালে, সামনে পড়লে মোবাইল নাম্বারই নিয়ে নেবে। পুলিশের এএসপিদের অধীনে কনস্টেবল থেকে শুরু করে অনেক পুলিশ সদস্য থাকে, তাই দেশের যেখানেই যাবেন, লজিস্টিক সাপোর্ট থাকবে।

অডিটঃ অডিটে অবশ্য সব সময়ই অল্প ক’টা পোস্ট থাকে। আর যেহেতু পোস্ট অল্প, তাই পদোন্নতি দ্রুত। মোটামুটি বিভাগীয় শহরগুলিতেই পোস্টিং। অডিট হচ্ছে অন্যের ভুল, অনিয়ম এসব ধরা। তাই যে অফিসেই অডিট করবেন, বেশ সম্মানই পাবেন।

ট্যাক্স ও কাস্টমসঃ সরকারের রেভিনিউ আদায়ের উৎস এই দুই ক্যাডার। দেশ যতো ধনী হচ্ছে, রেভিনিউ অফিসারদের গুরুত্ব ততো বাড়ছে। তাই এই দুটোই অনেক আকাংখিত ক্যাডার। রেভিনিউ আদায়ের জন্য আর্থিক ইনসেনটিভ সুবিধা আছে। পদোন্নতি মোটামুটি দ্রুত।

ইকনমিকঃ সচিবালয়ে বা পরিকল্পনা কমিশনে অফিস। তাই ঢাকায় পোস্টিং। ইকোনোমিক ক্যাডারের অফিসারগণ প্লানিংয়ের কাজ করেন। তাই যারা রিসার্চ রিলেটেড কাজে ইচ্ছুক, তাঁদের জন্য এটা ভাল চয়েস। কাজ সরকারের প্রোজেক্টের প্লানিং। হয়তো রিসার্চমুখী বলেই ইকনমিক ক্যাডারের অফিসারদের একটা বড় অংশ বিদেশে ডেপুটেশান বা শিক্ষাছুটিতে পড়াশুনা করে। পড়াশুনার সুযোগ ভালো।

তথ্যঃ তথ্য ক্যাডারের অফিসারদের কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কাজের সুযোগ আসতে পারে। মন্ত্রণালয়ে মাননীয় মন্ত্রীগণের Public Relations officer (PRO), বিদেশে কয়েকটা দূতাবাসে তথ্য কর্মকর্তা, এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ও মহামান্য রাষ্ট্রপতির অফিসেও তথ্য কর্মকর্তা হতে পারেন। তবে এগুলো সাধারণত স্বল্পকালীন হয়।

শিক্ষা ক্যাডারঃ এখন প্রায়ই ভাবি, আমি যদি মাঝে মাঝে শিক্ষক হতে পারতাম! টিনএজ ছেলেমেয়েদের পথ দেখানোর মত সুন্দর কাজ আর নেই। শিক্ষকতা সম্মানের এবং উপভোগ্য। শিক্ষকরা রিসার্চ করেন, জ্ঞান নিয়েই চলাফেরা।
I really envy teachers.

টেকনিক্যাল ক্যাডারঃ টেকনিকাল জ্ঞানকে দেশের কাজে বিশেষত সরকারের নীতিমালায় যারা কাজে লাগাতে চান, তাঁদের জন্য সঠিক জায়গা হচ্ছে টেকনিক্যাল ক্যাডারগুলো। আমি কম্পিউটার এঞ্জিনিয়ারিং এ স্নাতক, তাই আমিও টেকনিক্যাল লাইনেরই মানুষ। আপনার কষ্টার্জিত টেকনিক্যাল জ্ঞান দেশের কাজে লাগুক।

পররাষ্ট্রঃ এটাতে আমি চাকরি করি, তাই ঢাক পিটানো হয়ে যাবে কিনা ভাবছি। যাই হোক, ফরেনে চাকরি হলে আপনি সেগুন বাগিচায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দিবেন। দুই বছর পূর্ণ হলে আপনি বিদেশে দূতাবাসে পোস্টিংয়ের জন্য উপযুক্ত বলে ধরা হয়। তবে পোস্টিং হতে ৩ বছরের মত লাগে। কেউ কেউ নিজেই দেরী করে বিদেশে পোস্টিং নেয়। নেগেটিভ দিক হচ্ছে, অফিসার অল্প, তাই সব সময়ই কাজের অনেক চাপ। পরিবার ফেলে দীর্ঘদিন বিদেশে থাকা কষ্টকর। আবার এক দেশে পোস্টিং ৩ বছরের জন্য, এরপর অন্য দেশে ৩ বছর, পরের ৩ বছর ঢাকায়। এটা জেনারেল পোস্টিং প্যাটার্ন। এই ঘন ঘন চেঞ্জ নিজের, পরিবারের এবং ছেলেমেয়ের জন্য বেশ ঝামেলার। অন্যদিকে ফরেনে অফিসার অল্প বলে পদোন্নতির সুযোগ ভালো। এটা প্রচলিত ছিল যে – ফরেনে জয়েন করলে সে সাধারণত Ambassador হয়। ভবিষ্যতে কি হবে জানি না। রাষ্ট্রদূত দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে, তাই সম্মান মনে হয় একটু পাবেন। বেশ হোমরা-চোমরা লোকজনের সাথে মাঝেই দেখা বা মিটিং সিটিং হবে। তবে দেশে রাস্তাঘাটে আপনাকে কেউ চিনবে না।

ক’দিন আগে কয়েকজন তরুণ সাহিত্যিক কয়েকটা লেখা দিয়ে সমালোচনা করতে বলল। কিন্তু সমালোচনা করার পরে তাঁরা আমার উপর ক্ষেপে গেল। আমি নাকি সবাইরে প্রশংসা করে গেছি। আমার মন্তব্য থেকে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। কী করা খারাপ বলতে মনে হয় একটু বেশি সাহস লাগে। সেই বিষয়টা মাথায় রেখে, এখানে আমি একজন বিসিএস পরীক্ষার্থী যেভাবে ভাবে, সেভাবেই বিভিন্ন ক্যাডারের কিছু বিষয় দিতে চেষ্টা করলাম। এগুলো শুধুই তথ্য। অন্যদের কথাও শুনুন। এরপর নিজের বিচার দিয়ে ভাবুন – কোন কাজটা আপনি করতে চান। কোনটায় আনন্দ পাবেন। সেভাবেই চয়েস দিন। জব এনজয় না করতে পারলে ক্যারিয়ারকে ভালবাসতে পারবেন না। তাই আনন্দ খুঁজে পাওয়াই হোক চয়েসের ভিত্তি। এবার দুটা প্রশ্ন, যেগুলো মেসেজে অনেকবার এসেছে –

সার্কুলারে কোন একটা ক্যাডারে অল্প ক’টা পোস্ট আছে। তো সেটা কি চয়েসে দিব?
আমি বিসিএস-এর চয়েস নির্ধারণ করতে গিয়ে দেখি অডিটে মাত্র ২/৩ পোস্ট। তো বন্ধু বলল, এটা চয়েসেই দিবে না। কোটা বাদ দিলে ১/২ পোস্ট – সেটা চয়েসে দিয়ে কী হবে? এটা একেবারেই ভুল কথা। পোস্ট বেশি থাক আর কম থাক নিজে যেই চাকরিটা করতে চান সেভাবেই চয়েস দিন। আর পোস্ট পরবর্তীতে বাড়াতে বা কমাতে পারে। সাধারণত কমায় না। কখনও কখনও বাড়ায়। তাই যেসব ক্যাডারের সার্কুলার হয়েছে, সেগুলোতে আপনার পছন্দমত সিরিয়ালে চয়েস দিয়ে দিন।

মোট কয়টা চয়েস দিব?
আমার অভিমত হল – যেই চাকরি হলে আপনি অবশ্যই করবেন, শুধু সেগুলোই চয়েস দিন। এক্ষেত্রে ২টা ইস্যু। (১) যারা বিসিএসে যে কোন ক্যাডার হলেই চাকরি করবেন, তাঁরা সার্কুলার দেখে যেগুলোতে এপ্লাই করতে পারবেন, সবগুলো চয়েস দিয়ে দিন। (২) আর যারা মনে করেন – কয়েকটা ক্যাডার না হলে আসলেই চাকরি করবেন না, তাঁরা প্লিস অন্য ক্যাডার চয়েস দিয়েন না। চাকরি হল আর আপনি জয়েন করলেন না বা কিছুদিন পরে ছেড়ে দিলেন, সেটা সবার জন্য খারাপ। দেশের জন্যও খারাপ।
তখন আমার ২৮-তম এর ফাইনাল রেজাল্ট ও মেডিকেল হয়ে গেছে। কিন্তু গেজেট হয়নি। সেই সময় ২৯-তম বিসিএসের ভাইভা শুরু হয়ে গেল। এখন ২৮ আর ২৯ দুটোতেই আমার ফার্স্ট চয়েস ফরেন। আমি ২৯-তমের ভাইভা দিতেই গেলাম না। ভাবলাম – একটা পোস্ট নষ্ট করব কেন। আমার পরিচিত বেশ কয়েকজনকে দেখলাম – ২৮তমে ফার্স্ট চয়েস পেয়েও আবার ২৯-এ ভাইভা দিলেন। বললেন, তখনও গেজেট হয়নি। কী হয় কিছু বলা যায় না। রিস্ক তো আছেই। যাই হোক, তারা বেশি সতর্কতামূলকভাবে এটা করেছেন। ব্যক্তিগতভাবে এটা দোষের নয়। আইনসিদ্ধও বটে। কিন্তু যেটা হয়েছে, অনেকেই ২বার চাকরি পেয়েছে। আর দ্বিতীয়বার জয়েন করেনি। সে পোস্টগুলো ফাঁকা গেছে। কিছু নাকি কোটা থেকে পূরণ করেছে। এতে সরকারের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অনেক পোস্ট খালিই থেকেছে। আর কিছু যোগ্য লোক চাকরি পায়নি। হয়তো তাদের বয়স চলে গেছে। তাই আপনি যে চাকরিটা পেলে আসলেই করবেন, শুধু সেটাই চয়েস দিন। তবে যারা ক্যাডার চেঞ্জ করতে আবার পরীক্ষা দিচ্ছেন, তাদের ভাবনা ঠিকই আছে।
.
সবার জন্য শুভকামনা। অগ্রজের অগ্রিম অভিনন্দন।
……………
অব্যয় অনিন্দ্য (সুজন দেবনাথ) 

২৮-তম বিসিএস পররাষ্ট্র ( ৩য় )
[পুনশ্চঃ বিসিএস পরীক্ষার্থীরা আমাকে যেসব প্রশ্ন করেছে, মানে চয়েস দেয়ার জন্য তারা জা জানতে চেয়েছে, সেভাবেই তথ্য দেয়া হয়েছে। এ লেখা অভিজ্ঞ বা জ্ঞানীদের জন্য নয়]

SHARE