তিড়িং বিড়িং
ফারজানা রহমান

ইমুর সাথে তিড়িং বিড়িংয়ের বেশ খাতির। ইমু যখন ক্লাস টু’তে, তখন থেকে পরিচয়। এখন ইমু ক্লাস ফাইভে।
তিড়িং বিড়িংয়ের সাথে আলাপের মজার এক ইতিহাস আছে। কীভাবে হয়েছিল বলছি। ইমুর বাবা সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা। পোস্টিং চট্টগ্রামে। নির্ধারিত অফিসার্স কোয়ার্টার অনেক পুরাতন। এক কথায় গল্পে পড়া পুরাতন বাংলোর মতো। ইমু পুরো বাড়ি ঘুরে দেখার সময় চিলেকোঠার উপর এক আশ্চর্য ছায়া অবিষ্কার করে। দেখা মাত্র ছায়া সৃষ্টিকারী বস্তুটি খুঁজতে থাকে। কিন্তু পায় না। আশ্চর্যের বিষয় বটে! ইমু ভয় পেয়ে যায়। নিচে নামতে পারে না। হাঁটতে গেলেই পা যেনো মাটি কামড়ে ধরে। লোহার মত ভারি হয়ে যায়। হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন বলে, ‘তড়াং-বড়াং-তিড়ি-বিড়ি-কড়ি?’ শব্দগুলোর আগামাথা কিছুই বুঝলো না ইমু। পরে অবশ্য তিড়িং বিড়িংয়ের সাথে ভাব জমার পর জেনেছিলো, কথাগুলোর মানে-নতুন এসেছো?
কথা শুনে মনে মনে কী যেনো পড়তে থাকে। সাহস যোগানোর চেষ্টা করে। তারপর পেছন ঘুরে দাঁড়ায়। থর থর বুক নিয়ে কাচুমাচু করে না বুঝেই উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে সাই দেয়। তিড়িং বিড়িং তার ইয়া লম্বা হাত ইমুর দিকে বাড়িয়ে বলে, তড়িম বিড়িম তুড়িবা? (আমার বন্ধু হবে?)।
ইমু হাত বাড়ানো দেখে বুঝে ওঠে তিড়িং বিড়িং এর মানবদেহের মতো কোন আকার নেই। ইমু আর তিড়িং বিড়িং এর বন্ধুত্ব দিন দিন গভীর হতে থাকে। একবার ইমু অসুস্থ হয়ে পড়ল। তারপর ঘোরের ভিতর সে তিড়িং বিড়িং বলতে থাকে। চট্টগ্রাম বেস্ট ডক্টরকে আনা হল। তিনি বলেন, তিড়িং বিড়িং কে? মিসেস জোহ্রা বললেন, ‘এ নামে তো আমাদের পরিবারে কেউ নেই।’
সেদিন বিকেলে তিড়িং বিড়িং হাজির। অসুস্থতার ঘোরে ইমু একটু চোখ মেলেই তিড়িং বিড়িং কে দেখতে পায়।
তিড়িং বিড়িং তুমি এসেছ?
তড়ি, কিড়ি আড়ি অড়ি কাড়ি। (হ্যাঁ, আমাকে তো অসতেই হতো।)
তিড়িং বিড়িং এর আশ্চর্য সব ক্ষমতা ছিল। সে ইমুর গায়ে হাত দিতেই ইমু সুস্থ হয়ে উঠল। কিন্তু অসুস্থতার ভান করে ইমু পড়ে রইল। কারণ হঠ্যাৎ করে সুস্থ হলে সবাই সন্দহ করবে। এভাবেই তাদের বন্ধুত্ব চলতে থাকল।
তিড়িং বিড়িং আর ইমুর প্রথম ঈদ ছিল বেশ মজার। তিড়িং বিড়িং ইমুকে একটা লাল রঙের জামা গিফ্ট করে। কিন্তু ইমু ভেবেই পায় না একটা ভুত কী পেলে খুশি হবে।
সে সরাসরি তিড়িংকে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি আমার কাছে কি চাও তিড়িং? আমি তো জানি না তোমার কি পছন্দ। তুমি কি অমাকে একটু সাহায্য করবে?’
‘ইমু আমি তোমার কাছে যা চাই তুমি কি তা আমায় দেবে? তা কিন্তু খুবই মুল্যসাপেক্ষ।
তুমি ভেবে দেখ।’
ইমু ঘাবড়ে যায়। সে বলে আমি চেষ্টা করব।
‘আমার তোমার বন্ধুত্ব সারা জীবন চাই। দেবে আমাই?’
ইমু হো হো করে হাসে। সে বলে, ‘তিড়িং আমি ঈদের গিফ্ট এর কথা বলছি।’
‘ইমু আমি ঈদ উপলক্ষ্যেই চাইছি। ’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, দিব।’
ঈদের দিন দুজনে একসাথে খুব মজা করে। তিড়িং এর শক্তি দিয়ে বিভিন্ন জায়গা গুলোও ঘুরে আসে। তারা একসাথে ফয়েজ লেক এ যায়। পতেঙ্গা থেকে ঘুরে আসে। কক্সবাজার থেকে ঘুরে আসে।
‘ইমু অমার সাথে এক জায়গায় যাবে?’
‘কোথায়?’
‘বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারত করতে?’
‘তিনি কে?’
‘আমাদের জাতির পিতা। যার জন্য আজ আমরা এত শান্তিতে আছি। নেই কোন শোষক, নেই কোন শাসক।’
‘কোথায় তার কবর?’ জানতে চায় ইমু।
তিড়িং বলে, ‘গোপালগঞ্জ, টঙ্গিপাড়া। আশা করি তোমার ভালই লাগবে।’
তারা একসাথে জিয়ারত করল। বেশ ভালই কাটল তাদের দিনটা। অবশেষে বাড়ি ফিরল।
তিন বছর পর ইমুর বাবার পোস্টিং হয়ে যায়। এখন সে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। সে আজও তিড়িংকে ভুলতে পারে না।

 

SHARE