বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০১৭ ভাবনা- চাই হাজারো খুরশীদা বেগম : বাবুল চন্দ্র সূত্রধর

 

কুটুম পঙ্খী গাইত রে গান কুটুম আইব কইয়া
সোনার বাংলায় থাকত সোনা মাটিতে ছড়াইয়া
এখন সবই দেখি গেছে উড়ি রে,
কালের উল্টা হাওয়ার টানে রে-
বড় দুঃখ পাইয়া রে বাংলার বাউল মইরাছে।।

কালের উল্টা হাওয়ার টানে কুটুম পঙ্খী কুটুম আসার সংবাদ দেয় না, সোনার বাংলার মাটিতে সোনা ছড়ায় না- এই দুঃখে বাংলার বাউল মরে গেছেন!শুধু কি বাউলরাই মরে গেছেন? উল্টা হাওয়াটাই বা কি, যার শক্তিমত্তার কাছে পরাজিত হয়ে বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য পাল্টে গেছে?বিষয়টি গভীর ভাবনার বটে।

সংস্কৃতি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বা জীবনধারা সত্যিকার অর্থে সমাজের প্রাণ।এই প্রাণ আঘাতপ্রাপ্ত হলে সমাজ হয়ে পড়ে অসুস্থ, আধমরা; আর প্রাণ নিষ্ক্রিয় হলে সমাজ আর সমাজ থাকে না, হয়ে পড়ে অন্তঃসারশূন্য নিছক এক আবাসক্ষেত্র। বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে জোর আঘাত লেগেছে বলেই এমন অবস্থার উদয়- এতে শুধু বাউলরাই মরে গেলেন না, গোটা সমাজই আধমরা হয়ে গেল। বাংলার সমাজ কেন ও কিভাবে আধমরা হয়ে গেল, সে বিষয়ে বিস্তর গবেষণা রয়েছে। বর্তমানক্ষুদ্র প্রয়াসটি এসবেরই অংশ, তবে এটি একটি মৌলিক ও অত্যাবশ্যকীয় বিষয় নিয়ে পরিকল্পিত হয়েছে।এক কথায় বলতে গেলে বিষয়টি হলো “পরিবেশ বিপর্যয়”। আমাদের জানা আছে, প্রাকৃতিক পরিবেশ সামাজিক পরিবেশের অন্যতম নিয়ামক। প্রকৃতিতে যে মাত্রায় সুস্থ ও সুষমঅবস্থা বিরাজ করবে, সমাজেরও সে মাত্রা অনুসরণ না করে উপায় নেই। আরোও পরিস্কাভাবে বলেনবিজ্ঞানীরা; তারা মানুষকে দেহমানব ও মনোমানব- এই দু’ভাগে ভাগ করেন। পরিবেশও তাই- প্রকৃতি তার দেহ আর সমাজ তার মন। সুস্থ দেহে সুস্থ মন আর সুস্থ প্রকৃতিতে সুস্থ সমাজ।

ধরুন, খাল-বিল-জলাশয় ভরাট করে ঘরবাড়ী, কলকারখানা ও নানা স্থাপনানির্মাণ করায় মাছের উৎস বন্ধ করে দেওয়া হল; এতে মানুষের খাদ্যের আমিষের বৃহত্তম উৎস বন্ধ করে দেওয়া হল। তার প্রত্যক্ষ ও সুদূরপ্রসারী সামাজিক ফল হল খাদ্যের সুসামঞ্জস্যতা রক্ষা করা হল না→ স্বাস্থের ন্বাভাবিক অগ্রগতি রক্ষা করা হল না→ স্বাভাবিক ও সুস্থ চিন্তার পথ সঙ্কুচিত করা হল→নানা ধরনের সামাজিক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব মোকাবেলা করার পথ প্রশস্ত হল, ইত্যাদি। শুধু কি তাই? মাছ তথা প্রাণীজ আমিষের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে জৈব-অজৈব রসায়নভিত্তিক মৎস্য ও মুরগীর খামার, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বিরাট হুমকি বলে অভিজ্ঞজন বলে থাকেন। একইভাবে বন-জঙ্গল কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। এর ফলও নেতিবাচক। মানুষ উন্নয়ন, আধুনিকায়নবাসভ্যতার নামেই এসব করছে।কিন্তু প্রকৃতিকে সঙ্কুচিত করতে গিয়ে যে গোটা সমাজকেই সঙ্কুচিত করা হচ্ছে, তা হয়ত তলিয়ে দেখার সময়-সুযোগ হয়ে উঠছে না।

মানব সমাজের নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস সুক্ষভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পরিবেশের সৃজন, লালন, পরিচর্যা কিংবা পরিপুষ্টি সাধনের প্রক্রিয়াটি নারীদের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছিল।কালক্রমে একনির্লজ্জস্বার্থপরতার খপ্পরে পড়ে নারীদেরকে শুধু গৃহবন্দীই করা হল না, তাদের গৌরবময় কৃতিত্বটিও সুকৌশলে আত্মসাৎ করা হল। আধুনিক কালের উন্নয়ন চিন্তায় “পরিবেশ” প্রত্যয়টি বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী হলেও এতে নারীর কি অবদান ছিল, আছে এবং থাকা উচিৎ, সে বিষয়ে কোন সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। নারীর পরিবেশ সচেতনতা, জৈবিকতা, পরিবেশ রক্ষণাবেক্ষণে সহজাত প্রবণতা, পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রতি সাড়া প্রদান এক কথায় গঠনমূলক আত্মিক চেতনার কারণে পরিবেশের সাথে নারীর সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। নারীর জৈবিক নির্মাণ, র্গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান ও লালন-পালন প্রভৃতি বিশেষ গুণ নারী ও পরিবেশের মধ্যে গড়ে তুলেছে নৈকট্য আর পুরুষের সাথে এনে দিয়েছে স্বাতন্ত্র্য।প্রকৃতির বিনাশে পুরুষের অবদান কম-বেশি ১00%, একথা কোন পরিসংখ্যান ছাড়াই বলা যায়। এহেন আগ্রাসন বিশেষত উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশসমূহের নারীদেরকে একদিকে করেছে বিপন্ন, অপরদিকে আরোও অধিক মাত্রায় প্রকৃতি-ঘনিষ্ট করে তুলেছে।এসব অঞ্চলের নারীদের প্রাত্যহিক কাজে প্রকৃতির কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে পরিবেশ বিপর্যয়ের সাথে নারীসমাজের ক্রম-অবনয়নের বিষয়টি অত্যন্ত ঘনিষ্ট সম্পর্কে বিজড়িত।তাই পকৃতি বা পরিবেশ-পাবিপার্শ্বিকতারক্ষয়-ক্ষতিতে নারীরা বেশি সোচ্চার, ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিবাদীও।

                     খুরশীদা বেগম

বাংলাদেশে নারী ও পরিবেশের আন্তঃসম্পর্কের প্রধান ক্ষেত্রসমূহ পরখ করলে এ বিষয়ে ধারণা  স্পষ্টতর হবে। খাদ্য নিরাপত্তা, নিরাপদ পানি, জ্বালানী, পশুপালন, কৃষি ও শাক-সব্জি চাষ, বীজ ও শস্য সংরক্ষণ, কৃষিজমির স্বাস্থ্যরক্ষা, লোকচিকিৎসা এবং অনুরূপ অনেক অত্যাবশ্যকীয় উপাদান নারীদের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে থাকে। খাদ্য, কৃষি, স্বা্স্থ্য, গৃহ- এই চতুর্বিধজীবন-ঘনিষ্ট উপাদান সুপ্রাচীন কাল থেকেই নারীর ব্যবস্খাপনায় সাধিত হয়ে আসছে। যদিও নারীরা নামেও নেই, আর্থিক মূল্যায়নেও নেই। পরিবেশের বিপর্যয়ের ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে নারীর দূরত্ব ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে।বাংলাদেশের মত রাষ্ট্রে পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখ্য অনুঘটকগুলো নারীসমাজের এহেন অবস্থারই স্বাক্ষ্য দেয়ঃ

♦ বনভূমি ও জলাভূমি ধ্বংস করা

♦ জীব-বৈচিত্র্য ধ্বংস করা

♦ ভূগর্ভস্থ পানির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার

♦ রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার

♦ যত্রতত্র কল-কারখানা স্থাপন করে বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ সৃষ্টি করা

♦ অপরিকল্পিত ও ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক বাঁধ ও ঘের নির্মাণ

পরিবেশের বাণিজ্যিকীকরণ তথা কর্পোরেট নির্ভরতা সৃষ্টি

 

জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)অর্জনের  জন্য সমতা নিশ্চিতকরণে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণের ওপর জোর দিয়েছে। পরিবেশ ও উন্নয়নের সোথে সম্পর্কিত জাতিসংঘ সম্মেলন এবং জনসংখ্যা ও উন্নয়ন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিষয়টি স্বীকৃতি পায়।এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৫সনের বেইজিং চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে কিছু কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, যার অন্যতম হলঃ

  • পরিবেশগত সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের জন্য নারীর দক্ষতা ও যোগ্যতা বৃদ্ধি এবং সমতা সৃষ্টি একান্ত অপরিহার্য
  • রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পরিবেশগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর পরিপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে
  • টেকসই নারী উন্নয়ন নীতি ও কর্মসূচিতে জেণ্ডার সমতা নিশ্চিত করতে হলে র্সর্বাগ্রে প্রয়োজন পরিবেশ বিপর্যয় ও এর ফলে নারীর ওপর সুষ্ট প্রতিক্রিয়া রোধে প্রত্যেককে উৎসাহিত করা
  • প্রচুর গবেষণার মাধ্যমে বের করতে হবে পরিবেশ বিপর্যয়ে নারী কতটা বেশি নাজুক ও অরক্ষিত; এ সবের ফলাফল জাতীয় নীতিমালায় একীভুত করতে হবে
  • নারীর অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণে কাজে লাগানো যেতে পারে।

বস্তুত, দু’দশকের অধিক সময় অতিবাহিত হলেও বাংলাদেশ ও অনুরূপ দেশসমূহে বর্ণিত কৌশলগুলোর আবেদন একই অবস্থায় রয়ে গেছে বলে মনে হয়।

নারী ও পরিবেশের এহেন সাযুজ্যের সুচিন্তিত স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘের ক’টি অংগ সংস্থা ও অপরাপর ১০টি আন্তর্জাতিক সংস্থা ২০১২ সন থেকে পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ অবদানের জন্য “ওয়াংগারিমাথাই” নামে আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রবর্তন করেছে, যার প্রথম বিজয়িনী বাংলাদেশের মেয়ে খুরশিদা বেগম। কক্সবাজারজেলার টেকনাফউপজেলারকেরুনতলীগ্রামেরমেয়ে খুরশিদা২০০৬ সন থেকে ২৮ সদস্যবিশিষ্ট নারী প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা দল গঠন করে এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনিবন ও পরিবেশমন্ত্রণালয়েরঅধীনবনঅধিদপ্তরেরনিসর্গআইপ্যাকপ্রকল্পেরসহব্যবস্থাপনাকমিটিরসদস্য। অনেক প্রতিকুলতা মোকাবেলা করে তিনি সারা এলাকার সাধারণ মানুষ, ছাত্র-ছাত্রী, জনপ্রতিনিধিসহ সকলের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হন। ছোটবেলায়ইগাছ-গাছালি ও বন্য প্রাণীর প্রতি তার মমত্ব সৃষ্টি হয়।মাত্র অষ্টম শ্রেণী পাস খুরশিদাটেকনাফ ইউনিয়নের নির্বাচিত সদস্য ও স্থানীয় একটি শিশু স্কুলের প্রতিষ্টাতা ও শিক্ষক হিসেবও নিষ্টার সঙ্গে, সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।

প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশে যে হাজারো খুরশিদা বেগমের প্রয়োজন, তা আজ সপ্রমাণিত। এই খুরশিদা বেগমদের জন্য চাই কর্তৃপক্ষীয় প্রণোদনা ও উজ্জীবনাভিত্তিক সামাজিক পরিবেশ। আর সামাজিক এই পরিবেশ সৃষ্টির জন্য চাই সার্বজনীন মানবাধিকারের সযত্ন বাস্তবায়ন, যেখানে মানুষ মাত্রেই বিবেচিত হবেন ‘মানুষ’ হিসেবে; নারী, অবলা, সংখ্যালঘু, অশিক্ষিত, দরিদ্র কিংবা পুরুষ, সংখ্যাগুরু, শিক্ষিত, ধনী ইত্যাকার সুকৌশল সাম্প্রদায়িক আবরণে নয়। প্রত্যেক মানুষই কোন না কোনগেুণ ধারণ করেন- এসব গুণাবলীর সুসমন্বয় সাধনই উন্নয়নের আসল চাবিকাঠি।

সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় দেশের প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ সুস্থ ও সুন্দর হোক-ফিরে আসুক সেই কুটুম পঙ্খী আর সোনায় ছড়ানো চিরায়ত বাংলার মাঠ। বিশ্ব পরিবেশ দিবস সফল হোক।

 

লেখক :

মানবাধিকারকর্মী;
সহ-সমন্বয়ক, রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশ (রিইব), ঢাকা।
মোবাঃ ০১৭১২৬৪৯৬৪১। ই-মেইলঃ bc_sutradhar@yahoo.com

 

 

 

 

 

SHARE