চৌধুরী ফাহাদ এর কবিতা

ভ্রম ভ্রমণ

ছায়ার পাশেই কায়া বসে ছায়া হয়ে হামাগুড়ি নিঃশ্বাস ফেলে
বিপন্ন জীবনের আত্মপ্রতিকৃতি!
দরজার ওপাশে ঘেউ করে উঠলে কুকুর
তাড়িয়ে ফিরে আসে মানুষের মুখ
পর্দার ওপারে অন্যশোক-
তাড়িয়ে ফেরা মানুষের স্বরূপ দর্পণের ঘেউ চিৎকার
থামানোর চোখে নিজেরই অসুখ !
ছায়ার পাশেই কায়া হয়ে বসে শ্লেষনিঃশ্বাস ফেলে
গোপন জীবনের আত্মপ্রতিকৃতি
সব কুকুর তাড়িয়ে এসেও সেইসব বিপন্ন প্রাণের মৌনমুখরবেলায়
একটি কুকুরের মুখ কখনওই দেখা হয় না
আয়না ওভাবেই দেখায়, যা চাই-
আয়না,
নিজের আড়ালে লুকিয়ে নিজেকেই কখনো দেখে নাই

 

হাজার দোলনার গ্রাম

শিকড়ে রক্তের টান নিয়ে পরবাসী যুগ
এক একটা আঁচড়ে পাথর হতে থাকি বুকে
শ্বাস নিতে নামলে সেই সব বাঁধ রেখে
শহরের পথ ধরে ডেকে যায় হাজার দোলনার গ্রাম
আমি ডুবে যেতে থাকি ভেতর
আমি ফিরে যেতে থাকি ভেতর
অন্তর্যাত্রায় শিকড়
জন্মের ভেতর ঢুকে যাওয়া ছাড়া
মূলত: আমার আর কোন গন্তব্য নেই
এক একটা দিন শহরে বিলীন
এক একটা রাত পুড়িয়ে বুকে বটবৃক্ষের মত ব্যাকুলতা
এক একটা পথ পেরিয়ে যেতে যেতে বাঁকে
রক্তের বানে বেঁচে থাকে কেবল ধ্রুপদী ফেরা
হাজার দোলনার গ্রাম জন্মের প্রণাম
তুমি ছাড়া জানি না আর কোন ঈশ্বর নাম
আমি ডুবে যেতে থাকি ফেরার ভেতর
আমি ফিরে যেতে যেতে অন্তগহীন ভেতর
আঁকতে থাকি প্রাণে জন্ম আদর
অন্তর্যাত্রায় ঈশ্বর নাম
আমার হাজার দোলনার গ্রাম
তোমার ভেতর ঢুকে যাওয়া ছাড়া
আমার দ্বিতীয় কোন গন্তব্য নেই
মূলত: তুমি ছাড়া আমার আর কোন গন্তব্য নেই…

 

 

এখনও রাত

দিনজুড়ে রাতের সওদা করে
সন্ধ্যা নামলেই ডাহুক চোখে মেঘ নিয়ে ঘরে ফিরছি!
আমাদের জীবনজুড়ে কেবল রাত, কেবলই রাত…

 

মুঘল সম্রাজ্য পেরিয়ে ওলন্দাজ সীমান্ত ছুঁয়ে ব্রিটিশরাজ বুকে
নাপাক স্বরাজের রক্তে বন্ধ হয়ে আসে চোখ, আমরা কোথাও নাই!
আমাদের ইতিহাসজুড়ে কেবল রাত, কেবলই রাত…
স্বপ্নের সেই সওদাগর-
বুকে দাগ নিয়ে অসুখের সুখে ভেসে পথ পেরিয়ে গেছে রায়টের পর,
আঙ্গুলের ফলা ধরে পথ হবে পথের, কেউ নেই…
বাঁশিওয়ালারা এসে সুর তুলে মুখে ফিরে যায় আবার ফেরায় ।
স্বপ্ন ছিল চোখে, স্বপ্ন কাঁদে মুখে মায়াশোকে-
সেই স্বপ্নের সওদাগর নেই…

 

হাভাতের পরে পুরনো শকুনের অধিকারে সেই সব সোনালী কাঁথার মাঠ
স্বৈরতাপের ঘরে মাটিমুখ জ্বলে জলে ধুয়ে গেছে ধার, লালিত সংসার,
উত্থানপর্বেও সেই পুরনো ব্যথার টান, আলোতে নিমজ্জিত আঁধার!
আমাদের ইতিহাসে রাত, আমাদের জীবনজুড়ে কেবলই রাত…

 

 

আলোকলতা

আলোকলতা হে! দ্বীপ জ্বালাও-
ফণীমনসার আকাশ আমি
বেতফলরঙা বিকেল ধরে আছি মণিতে
চোখ গভীরে নিতে জানলে মেখে নিতে পারো ক্লিওপেট্রা রঙ-
আমাকেও…
আলোকলতা হে! দ্বীপ জ্বালাও-
ধমনীরিক্ত আস্থিরতা আমি, প্রণয়ের
বুক গভীরে নিতে জানলে আত্মস্থ করতে পারো
নরোম সিম্ফনি ও দাঁড়িকমাহীন স্পন্দন
নিঃশ্বাসের অবিনশ্বরতায় হয়ে উঠো পড়াবাস্তব কিউপিড
আফ্রোদিতি হ’বো আমি-
বালিকা বয়ানে…
আলোকলতা হে! দ্বীপ জ্বালাও…

রাত নেমে আসছে মেঘডাকাতের বেগুনী খামে
রাতের শহরে প্রেমিক সবই, হৃদয় নাই…
আলোকলতা হে! দ্বীপ জ্বালাও…

 

 

 

লবণ

-ভুলে গেছ!
— উহু! ভুলি নাই!
– মনে ছিলাম!
— উহু। মনে পড়ল!
– তবে ভুলেই গেছ!
— ভুলে গেলে তবে কি মনে পড়ত?
– আমিই তো মনে করিয়ে দিলাম!
— যদি ভুলে যাই তবে এই নাম ক্যামনে স্মরণ থাকে? এই যে ডাক দিলে মস্তিষ্কের সমস্ত নিউরন, সব সেল বন্ধ রেখে তুমি মুখী, তোমাকে নিয়ে আয়োজন! তাকে কি ভুলে যাওয়া বলে?
– আমি ডাক দিলাম বলেই তো এই পিছুটান! আদানে আমি ছিলাম না, আমার ছিল না। আমার উপস্থিতি জেনেই আমাকে নিয়ে ছোটাছুটি। ডাকহীন মনে না রাখা কি ভুলে যাওয়া নয়?
— ভুলে যাওয়া বলতে স্মৃতিনাশ বুঝি! ডান হাতের কব্জিতে যে কাটা দাগ দেখো, মনে নেই কোন শৈশবে- কখন কিভাবে কেটেছি নিজেকেই। চোখে পড়তেই স্মৃতি হাতড়াই! নির্বাক সব! কেবল ওই কাটা দাগটাই সরব! ভুলে যাওয়া বলতে একটা সময়ের মুছে যাওয়া বুঝি! তুমি তা নও…
– সব ছল! অজুহাতে মন ভুলানোর কৌশল। নচেৎ আমি আছি বলে, ডাক দেই বলে, নিজেকে জাগাই বলে তোমার মাঝে কখনও কখনও মনে পড়ে আমাকে! সবই ছল…
— হ্যা! ছল সবই! এই যে মায়া-ভালোবাসা, যাকে হৃদয়ের অবিচ্ছেদ্য ভাবি, দেখি কি তাকে? অথচ জানি আছে, হৃদয়ে- রণনে, স্নায়ুতে-আয়ুতে, নীরবে বয়ে যায়, জানি আছে। সবই তো ছল, প্রণয়, হৃদয়েরই কৌশল! যাপনজনিত ব্যস্ততা রেখে পাশে ভাবনাকে একমুখী ছুটাও হৃদয়াদল!
– তবে কি ভালোবাসা মোহ? কেবলই উপস্থিতির টান?
— মোহ নয়, তবে মোহাবিষ্ট! মোহ ছাড়া হৃদয়ের বর্তমান, মায়ার অবস্থান কেবলই কাল্পনিক।মানুষে মানুষে, হৃদয়ে হৃদয়ের আকর্ষণ কেবলই অর্থহীন নয়, ওখানেও প্রেম আছে!
– যদি কেটে যায় এই মোহ? যদি দেয়াল উঠে যায় হৃদয়ের চারপাশে?
— এই যে আমার অনুপস্থিতি তোমাকে পোড়ায়, তোমার নীরবতায় জ্বলি আমি, এখানে হৃদয় আছে, মায়া আছে। মোহের পথ ধরে যে অনুরণন প্রাণজ হয়ে উঠে তা কাটানোর মন্ত্র এখনও শিখে উঠেনি মানুষ। এইসব জ্বলনের গভীরে ভালোবাসা আছে, আছে কাছে থাকার দুর্নিবার আকুতি।
– তারপরও যদি ফিকে হয়ে আসে টান, মরে যায় ভালোবাসা!
— ভালোবাসা মরে না কখনও, ভালোবাসায় মরে না কেউ! বেঁচে থাকে অনির্ণীত পথ সুখে-দহনে!
– এইসব ভাবতে ভাবতে একলা গোপনে ভয় হয় খুব, খুবই…
— ভয় যদি না থাকে হারানোর, তবে ভালোবাসা এক টানহীন সরলরেখা! অনির্ণীত বলে প্রণয় পথ মানুষ এখনও হৃদয়ে চাষাবাদ করে হৃদয়ের! ভালোবাসায় ভয়ও ভালোবাসার নাম!