ধর্ষণের কারণ নারী নয় ধর্ষক নিজেই ।। কেয়া তালুকদার

যে কোন ধর্ষণের ঘটনা আলোচনা করতে গেলেই ধর্ষণের কারণ হিসাবে নারীর পোষাক, চলাফেরাকে দায়ী করা হয় ৷ একজন পতিতাও যদি রাত তিনটার সময় রাস্তায় থাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার সাথে যৌন সম্পর্ক ঘটলে সেটাকেও ধর্ষণ বলা হবে ৷ তেমনি ভাবে যে কোন নারীর যে কোন সময়ে স্বাধীনভাবে যে কোন জায়গায় যাওয়ার অধিকার আছে ৷ নারীকে দেখলেই তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়া তথা উত্তোক্ত করার অধিকার কারো নেই ৷ তাকে প্রভাবিত করে কৌশলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করার জন্য ধর্ষকই দায়ী ৷ নারীর শরীরের অধিকার একমাত্র তার ৷ একজন স্ত্রীকেও তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করাটাও ধর্ষণের পর্যায়ে পড়ে ৷ উন্নত দেশগুলিতে এর জন্য আইন আছে ৷ নারীর পোষাক সবসময় আলোচনায় আসে যখন কোন ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৷ অধিকাংশ নারী পুরুষ নির্বিশেষে নারীকেই দায়ী করে ৷ নারী তখন সবার কাছে হয়ে যায় বেশ্যা ৷ ধর্ষণ তো পুরুষদের বিকৃত রুচির পরিচয় বহন করে ৷ এটি একটি মানসিক রোগ ৷ নারী দেখলেই পুরুষদের যদি লোল পড়তে থাকে নারী তাহলে কি যৌনপ্রাণি ! নারী দেখলেই পুরুষদের যৌন শুড়শুড়ি উঠে যায় ৷ তাই যখন ইচ্ছে তখন যৌন চাহিদা মেটাতে নারীর সম্ভ্রম কেড়ে নিতে হবে ? বাইরের দেশগুলোতে সমুদ্রতীরে স্বল্প পোষাকে নারীরা ঘুরে বেড়ায় সেখানে তো কোনো ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনা ৷ এটি অবশ্যই পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গীর ব্যাপার ৷ আমাদের দেশে বোরখা, হিজাব পড়া এমনকি শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৷ তাহলে এই ঘটনাগুলোকে কি বলবেন ? শিশুর শরীরও কি ভোগের মত প্রস্তুত ? এমনকি আট মাসের শিশুও রক্ষা পায়নি ধর্ষণ থেকে ৷ এছাড়াও ছোট ছেলেরাও এই ধর্ষণের শিকার হচ্ছে ৷ এখন কন্যা শিশু জন্ম দিয়েই অভিভাবক তার নিরাপত্তা নিয়ে শংকায় থাকেন ৷ অনেকেই বলেছেন ধর্মীয় শিক্ষা ধর্ষণ কমাবে ৷ আমি বলবো না, কারণ মাদ্রাসার হুজুররাও এখন ধর্ষণ কাজে লিপ্ত ৷ তার ধর্মীয় শিক্ষার কি অভাব ছিলো ? আমরা নারীকে সব সময় ভেবে এসেছি তারা থাকবে ঘরে ৷ যখনই নারী ঘর থেকে বের হয়ে শিক্ষাঅর্জন কিংবা চাকুরী করছে এটি অনেক পুরুষদের চক্ষুশূল হয়েছে ৷ তাই নারীকে ধরো শোষণ করো, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করো, ইভটিজিং করো, এসিড মারো, ধর্ষণ করো, হত্যা করো ইত্যাদি ৷ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারী পুরুষের অধীন, সেবা দাসী এবং তাদের মতে নারীর জন্ম হয়েছে তার শরীর ভোগ করার জন্য ৷ কিন্তু একজন নারীর নিজস্ব স্বত্তা আছে, সে একজন মানুষ ৷ তার মতামতের বিরুদ্ধে অনাধিকার চর্চা চলছে যুগ যুগ ধরে ৷ একজন পুরুষ যদি জোর করে তার শরীর ভোগ করতে না আসতো তাহলে কি ধর্ষণ ঘটতো ? নারী রাতে হোক দিনে হোক যে কোন সময় প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যাবে ৷ তখন কেন ধর্ষণের ঘটনা ঘটবে ? এক সময় এসিড নিক্ষেপ বেড়ে গিয়েছিলো, তখন ক্যাম্পেইন করে, এসিড দ্রব্য কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণ করে ও আইন কঠোর করে তা প্রায় কমে গেছে ৷ এখন ধর্ষণের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন করে, অভিভাবক ও সবার মাঝে এর সচেতনতা বাড়াতে হবে ৷ বিচার বিভাগকে সঠিক বিচার করতে হবে ৷ পুলিশ প্রশাসন মামলা নিতে যেন গরিমসি না করে সে ব্যাপারে আলাদা করে প্রতিটি থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন টিম গঠন করতে হবে ৷ কারণ ধর্ষণের পর একজন ধর্ষিতাকে সামাজিক ভাবে হেয় করা হয় ও প্রভাবশালীদের ভয়ে থানা মামলা নিতে চায় না ৷ তারা যাতে নির্দ্বিধায় মামলা করতে অনুপ্রাণিত হয় ৷ যে সব ঘটনার মামলা হয় সেগুলো আমরা জানি ৷ কিন্তু এমন অনেক অভিভাবক আছেন তারা মান সন্মানের ভয়ে মামলা করতে যায়না ৷ কারণ ধর্ষিতার বাড়ীর সামনে গিয়ে সাংবাদিকরা ভীড় জমায় ৷ মিডিয়া এসব ঘটনাকে রসালো মনে করে ধর্ষিতার মানহানি করে ৷ ধর্ষিতা মেয়েটি বিচার চাইতে গিয়ে আরো অনেক ক্ষেত্রে বহুবার ধর্ষিত হয় ৷ মানবাধিকার সংস্থাকেও ধর্ষণ প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে ৷ গ্রাম ও শহরে যে ঘটনাই ঘটুক না কেন তার গুরুত্ব দিতে হবে ৷ কারণ আমাদের প্রতিবাদ সমাবেশ গুলো শুধু শহরের ধর্ষণ ঘটনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় ৷ নারীর ক্ষমতায়নের পথ চলাটা হোক নিরাপদ ও নির্ভাবনাময়, পুরুষদের বিকৃত মানসিকতার শিকার থেকে যাতে নারী রক্ষা পায় তার জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে ৷ প্রয়োজনে ধর্ষকদের মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে ৷ আমাদের দেশনেত্রীকে এ ব্যাপারে সুপদক্ষেপ নেয়ার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করছি ৷ না হলে বিচার না পেয়ে ধর্ষণের পর আত্মহত্যার পরিমাণ দিন দিন বেড়ে যাবে ৷