পাঠক আছে বইপ্রেমী নেই

বইপ্রেমীদের জ্ঞানের পিপাসা নিবারণের জন্য প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বই সংযুক্ত হচ্ছে সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারে। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, সংগীত ও গবেষণামূলক বইসহ দেশ-বিদেশের জনপ্রিয় সব লেখক ও কবিদের বই এবং রাজধানী থেকে প্রকাশিত জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং সাময়িকীর নতুন-পুরাতন সংখ্যার বিশাল সমাহার। তাই এই গণগ্রন্থাগারে প্রতিনিয়ত বাড়ছে পাঠকের সংখ্যা। কিন্তু সেভাবে বাড়ছে না প্রকৃত বইপ্রেমীর পদচারণা। সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগার ঘুরে বিস্তারিত জানাচ্ছেন  হোসাইন ।

পাঠ্যবইয়ের বাইরে গল্প, উপন্যাস ও গবেষণামূলক বইসহ বিভিন্ন ধরনের বই পড়ার শখ ছোট-বড় সব বয়সী মানুষেরই। কখনো কখনো শখের বইটি দোকানে খুব সহজে পাওয়া গেলেও আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় বইটি কিনে পড়া সম্ভব হয় না। আবার কখনো কখনো কেনার সামর্থ্য থাকলেও প্রয়োজনীয় বইটি সহজেই কোথাও পাওয়া যায় না। তাই সামর্থ্য থাকুক আর নাই থাকুক খুব সহজে যেন পছন্দের বইটি হাতের নাগালে পাওয়া যায় সেজন্য স্থাপন করা হয় জাতীয় এ গণগ্রন্থাগারটি।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে গণগ্রন্থগারের প্রাঙ্গণ মুখরিত হতো বইপ্রেমীদের পদচারণায়। কিন্তু গত প্রায় ৫ বছর ধরে কমতে শুরু করেছে বইপ্রেমীর সংখ্যা। এখন চাকরির প্রস্তুতি নিতে আসা পাঠকের ভিড়ে বইপ্রেমী সেসব মানুষের দেখা মেলেই না। নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে চাকরিপ্রার্থীরা প্রস্তুতির জন্য গ্রন্থাগারে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভিড় করে। সকাল ৮টা থেকে গন্থাগারটি খোলা হলেও চাকরিপ্রার্থীরা সকাল ৭টায় এসে হাজির হয় গ্রন্থাগারের গেটে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অনেক সময় কোনো কোনো চাকরিপ্রার্থী আসনই পান না। কক্ষ ও আসন যা আছে তাতে চাকরিপ্রার্থীদেরই ঠাঁই হয় না। গ্রন্থাগারটিতে ৬শ’আসন থাকলেও চাকরিপ্রার্থীদের ভিড়ের কারণে কোনো আসন খালি থাকে না। ফলে একদিকে চাকরিপ্রার্থীদের ভিড় অন্যদিকে পর্যাপ্ত আসন ও কক্ষ সংকটের কারণে বইপ্রেমীরা গ্রন্থাগার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

গ্রন্থাগার ঘুরে দেখা যায়, সবাই খাতা-কলম আর চাকরির প্রস্তুতিমূলক গাইড বই নিয়ে পড়াশোনায় ব্যস্ত। দু’একজন ছাড়া কাউকে গল্প-উপন্যাস কিংবা গবেষণাধর্মী কোনো বই পড়তে দেখা যায়নি। গ্রন্থাগারিকরা জানান, বইপ্রেমী পাঠকদের জন্য এটি উন্মুক্ত থাকলেও চাকরি ও বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে আসা পাঠকের সংখ্যাই বেশি। কিন্তু পাঠকদের এ বিষয়ে বাধা দেওয়ার কোনো নিয়ম না থাকায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। যে কারণে বইপ্রেমীদের নিয়ে অন্য চিন্তা-ভাবনা করছেন তারা।

in

বইপ্রেমী আজমল আহমেদ নামে একজন ব্যাংকার  বলেন, ‘২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত নিয়মিত এ গ্রন্থাগারে যেতাম। কিন্তু অবসর সময়ে যখন যাই, তখন দেখি পাঠ কক্ষগুলোতে কোনো আসন খালি নেই। প্রথম প্রথম মনে করতাম, সবাই আমার মতো বই পড়তে আসে। কিন্তু কয়েকদিন খোঁজ নিয়ে দেখলাম সবাই তরুণ। তারা বই পড়তে আসেন না। মূলত চাকরির প্রস্তুতি নিতে বাড়ি থেকে বই-খাতা নিয়ে এখানে এসে পড়াশোনা করতে আসে। তাদের কারণে বইপ্রেমীরা শখের বইটি পড়ার সুযোগ পান না।

তিনি মনে করেন, গ্রন্থাগারটির ব্যবস্থাপনায় আরো সচেষ্ট হওয়া দরকার। না হলে একসময় এটি আর গ্রন্থাগার থাকবে না, এটি পরীক্ষার প্রস্তুতি কেন্দ্র হয়ে যাবে।

বইপ্রেমী মানুষদের জ্ঞানের পিপাসা নিবারণে ১৯৫৫ সালের ১০ মে তৎকালীন শিক্ষা বিভাগের ১৪৯১-শিক্ষা আদেশ বলে ‘সোশ্যাল আপলিফট’ প্রকল্পের অধীনে কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক মঞ্জুরি ঘোষণা করেন। এরপর ১৯৫৮ সালের ২২ মার্চ মাত্র ১০ হাজার ৪০টি বই নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গ্রন্থাগারটির উদ্বোধন করা হয়। পরে ১৯৭৭ সালে গ্রন্থাগারটিকে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের পাশে নবনির্মিত ভবনে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৭৮ সালের ৬ জানুয়ারি ৬২ হাজার ৩০০ বর্গফুট আয়তনের নতুন ভবনটি গ্রন্থাগার হিসেবে উদ্বোধন করা হয়।

 

সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, সব শ্রেণিপেশার মানুষের জন্য ২ লাখ ৬ হাজার ৯ শ’ বইয়ের সুবিশাল সংগ্রহ নিয়ে জাতীয় গণগ্রন্থাগারে রয়েছে পাঁচটি পাঠকক্ষ। এরমধ্যে রয়েছে- সাধারণ পাঠকক্ষ, বিজ্ঞান পাঠকক্ষ, রেফারেন্স পাঠকক্ষ ও শিশু পাঠকক্ষ। সাধারণ পাঠকক্ষ রোববার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শিশু পাঠকক্ষ সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। বিজ্ঞান ও রেফারেন্স পাঠকক্ষ প্রতি শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এই সময়সীমায় গ্রন্থাগারটি থেকে পাঠক সেবা, রেফারেন্স সেবা, সাম্প্রতিক তথ্য জ্ঞাপন, পরামর্শ, নির্বাচিত তথ্য বিতরণ, পুস্তক লেনদেন, ফটোকপি, পুরাতন পত্রিকা প্রদর্শন সেবা পাওয়া যায়। এছাড়াও সব শ্রেণির পাঠকের জন্য ফ্রি ইন্টারনেট সেবা রয়েছে। বিনা মূল্যে এ সেবা পাওয়া য়ায়। তাই চাকরি প্রস্তুতি নিতে একে পাঠকরা উপযুক্ত মনে করেন।

বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গ্রন্থাগারে প্রতিদিন আসেন হৃদয় নামের একজন পাঠক। তার বাসা ঝিগাতলায়। তিনি প্রতিদিন বিসিএস গাইড ও খাতা-কলম নিয়ে আসেন। সেইসঙ্গে সব পত্রিকা ও সাময়িকী থাকায় প্রস্তুতির জন্য উপযুক্ত স্থান বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘বাসায় পড়াশোনার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় এখানে পড়তে আসি।’ কোনো গল্প, উপন্যাস পড়েন কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলো পড়ার সময় কই? গাইড পড়ে শেষ করার সময় হয় না। তাছাড়া পরীক্ষায় ওসব থেকে কোনো প্রশ্ন না আসায় সবাই গাইড বই নিয়ে পড়াশোনা করেন।’

গ্রন্থাগারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে পাঠকসংখ্যা ছিলো ৭৫ হাজার ৪৮৪ জন। মার্চ মাসে পাঠকসংখ্যা ছিলো ৮১ হাজার ১৩২ জন। তবে ৩ হাজার ৪৯ জন শিশু পাঠক ছাড়া বাকি সবাই চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে কিংবা বিসিএস প্রস্তুতি নিতে গ্রন্থাগারে এসেছিলেন। গ্রন্থাগারে সদস্যসংখ্যা মাত্র ২৫০ জন। নিয়মানুযায়ী, ৫০০ টাকা ফেরতযোগ্য শর্তে ফরমের মাধ্যমে সদস্যপদ নিতে হয়। সদস্য হওয়ার পর ১৫ দিন পর্যন্ত বিনা মূল্যে বাড়ি নিয়েও বই পড়া যায়। যদি নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে বই ফেরত না দেওয়া হয় তবে প্রতিদিন ১০ টাকা করে ফি দিতে হবে।

সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের মহাপরিচালক আশিষ কুমার সরকার  বলেন, ‘বইপ্রেমী পাঠকের সংখ্যা বাড়াতে কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৩ তলার একটি ভবন নির্মাণের নকশা প্রণয়নের প্রাথমিক কাজ শেষ হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে বইপ্রেমী ও অন্যান্য পাঠকের জন্য সুবিশাল জায়গার সৃষ্টি হবে।’

SHARE