স্বপ্নলোকের চাবি-৪

কয়েক হাজার বছর ধরে পৃথিবীর সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষ হিসেবে সবাই একবাক্যে এরিস্টোটলকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। জ্ঞানের ইতিহাসে তাঁকে বলা হয় The Philosopher. হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ ভাবতো – এরিস্টোটল সর্বজ্ঞ। তিনি যা বলে গেছেন, তাতে কোন ভুল নেই। তিনি যা চিন্তা করেননি, তা ভাবার দরকার নেই, বরং ভাবলে সেটা অপরাধ। এরিস্টোটলের মৃত্যুর কয়েকশ বছর পরেও, তাঁর কথার বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য কত মানুষকে জেল, জুলুম সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু সময়ের প্রবাহে আমরা জানতে পেরেছি এরিস্টোটল মোটেই নির্ভুল নয়, বরং তাঁর অনেক কিছুই হাস্যকর রকমের অজস্র ভুলে ভরা।
তার মানে কি এরস্টোটল ব্যর্থ? তার অর্জন শেষ? কখনোই না। অসংখ্য ভুল করা সত্ত্বেও তিনিই পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে সফল মানুষ। তিনিই জ্ঞান-বিজ্ঞানের সবচেয়ে বেশি শাখার স্রষ্টা। আজো তিনি সকলের পূজনীয়। কিন্তু কারণটা কি? কোন রহস্যের কারণে তিনি শত শত ভুলকে অতিক্রম করে পৃথিবীর সবচেয়ে সফল মানুষ হিসেবে আজো স্বীকৃত? উত্তরটা খুবই সিম্পল – আত্মবিশ্বাস আর নিরন্তর পরিশ্রম। তার নিজের উপর ছিল অগাধ বিশ্বাস আর তিনি হার না মেনে সারা জীবন কাজ করে গেছেন। তিনি কখনওই থামেননি। আজীবন তীব্র আগ্রহ নিয়ে সামনে যা পেয়েছেন, সব কিছুর জন্য চেষ্টা করে গেছেন। কারো জন্য অপেক্ষা করেননি। নিজে বিশ্বাস করতেন আমি এরিস্টোটল, আমি যা বলছি তাই সঠিক। সেই সময়ের যন্ত্রপাতিহীন পৃথিবীতে শুধু নিজের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা দিয়ে যা বুঝতে পেরেছেন, প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে সেসব কথাই তাঁর ছাত্রদের বলে গেছেন। তাতে অনেক ভুল ছিলো। কিন্তু সেই ভুলে ভরা তথ্যেই একে একে জন্ম হয়ে গেছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অজস্র শাখা। তিনি নিঃসন্দেহে মেধাবী। কিন্তু তাঁর মেধার চেয়েও আত্মবিশ্বাস আর প্রচেষ্টাই তাঁকে দিয়েছে সর্বকালের সেরা জ্ঞানী মানুষের খেতাব। নিরন্তর কাজ করে যাওয়ার কারণেই তিনিই জ্ঞান জগতের সবচেয়ে বড় সেলিব্রেটি। কি পরিমাণ কাজ করে গেলে, শুধু তাঁর ভুলগুলো নিয়েই এখন অসংখ্য মানুষ পিএইচডি করে।

তাই, হে আজকের কর্মবীর, তুমি থেমো না। তোমার জীবনের সেলিব্রেটি তুমি। তুমিও বিশ্বাস করো – তুমি আজকের এরিস্টোটল। যদি ভুল হয়ে থাকে তো হয়েছে। না জেনে যদি এখনো ভুল হয়, তো হোক। আমি থামব না। প্রতিটি চেষ্টা আমি শেষ পর্যন্ত দেখব। চেষ্টা না করে আমি হারব না। মহাভারতের বীরদের মত আমারও এক কথা – ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচাগ্র মেদিনী’। প্রতিদিনের একটু একটু কাজের দ্বারা আমি এতো কিছু করব যে পৃথিবীতে তার ছাপ থাকবেই।
হে, নতুন দিনের এরিস্টোটল, তোমাকে স্বাগতম।

লেখক// সুজন দেবনাথ (অব্যয় অনিন্দ্য),  ফার্স্ট সেক্রেটারি, বাংলাদেশ দূতাবাস, এথেন্স

SHARE